৫৪৩ দিন পর মুখরিত শিক্ষাঙ্গন-মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার।

মুক্তমত

 

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। ৫৪৩ দিন পর আবারো মুখরিত হলো শিক্ষাঙ্গন। যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি প্রমাণ করে তাদের অধীর আগ্রহ আর আবেগ মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো; এই ক্ষণটির জন্য। শিক্ষকবৃন্দ অনেক আনন্দিত। অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে অনেককে আবেগাপ্লুত হতে দেখেছি। অভিভাবকদের মাঝেও উচ্ছ্বাস অবলোকন করা গিয়েছে। তারাও মহাখুশি। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছুটা উদ্বেগও আছে। তাই তাদের প্রত্যাশা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনায় শৈথিল্য কাম্য নয়। তাছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সংক্রমণ বাড়লে আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। গত বছরের ১৭ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রথম ঘোষণা এসেছিলো। অনেকবারই আশান্বিত করা হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয় নি। করোনা পরিস্থিতির কারণে সম্ভব হয় নি। অথচ পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোর দৃশ্য ভিন্ন ছিলো। সংক্রমণ বাড়লে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। আবার সংক্রমণ কমলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল দেয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া দরকার ছিলো। সুস্থতা ও মানসিক বিকাশে তা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিলো। স্কুল-মাদ্রাসা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বন্দীর ন্যায় জীবন অতিবাহিত করছিলো। গ্রামাঞ্চলের পরিবেশ কিছুটা ভিন্ন হলেও শহর ও নগরের শিশু-কিশোররা অত্যধিক আবদ্ধ। অনলাইনে ক্লাস চালু হলেও সমানভাবে সবখানে বাস্তবায়িত হয় নি। শহরাঞ্চলে এর কিছুটা কার্যকারিতা থাকলেও গ্রামাঞ্চলে অত্যধিক গ্যাপ পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সমস্যা আর্থিক দুর্বলতা। উপযোগী মোবাইল ক্রয়ের সামর্থ না থাকাটা একটি বড় সমস্যা। যেসব শিক্ষার্থীরা এন্ড্রয়েড ফোন, স্মার্টফোন ব্যবহার করেছে, তাদের মাঝে আবার কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পড়াশুনার বাইরে তাদের একটি বিশাল অংশের মধ্যে মোবাইল আসক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল গেমে অভ্যস্ত হওয়াটা তাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর, তাতে সন্দেহ নেই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সাহচর্য, তত্ত্বাবধান এবং পাঠদান থেকে বঞ্চিত ছিলো। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকবৃন্দ শিক্ষার্থীদের মাঝে যে প্রভাব বিস্তার করেন, সরাসরি ক্লাস না থাকায় তা অনেকাংশেই উপেক্ষিত ছিলো। পাঠদানের পাশাপাশি নৈতিকতার যে প্রশিক্ষণ দেয়া হতো, তা থেকে শিক্ষার্থীরা প্রায় বঞ্চিত ছিলো। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অগণিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে গিয়েছে, এমন তথ্য অসত্য নয়। বিশেষ করে অনিয়মিত এবং অমনোযোগী ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনায় ঘাটতি হওয়াটা স্বাভাবিক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ী হওয়ার যে প্রশিক্ষণ পেতো, তা ভার্চুয়ালী পুরোপুরি সম্ভবপর হওয়াটা আশা করা যায় না।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকরা ভীষণ ক্ষতির মুখোমুখি। আর্থিকভাবে খুবই কষ্টে সময় পার করছেন। বলা যায়, অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যাদের কাঁধে পরিবারের দায়িত্ব, তারা পরিবারের ভরণপোষণে অপারগ হয়ে পড়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শিক্ষকদের মাঝে হতাশা বিরাজমান। এ সমস্যার সমাধানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার বিকল্প ছিলো না। বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং শিক্ষকদের সরাসরি তত্ত্বাবধান ও গাইডলাইন প্রদানে বাস্তব কারণেই যে ঘাটতি হয়েছে, মা-বাবাকে তা রিকভার করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মেধা, মনন ও নৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে হবে। অবশ্য এই দায়িত্ব সাময়িক নয়, বরং মা-বাবার স্থায়ী কর্মনীতি হওয়া উচিৎ। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) নবী করীম (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাথে কোমল ব্যবহার করো এবং তাদেরকে উত্তম আদব-কায়দা, তালিম ও তারবিয়াত শিক্ষা দাও। (ইবনে মাজাহ)

বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া অনস্বীকার্য বাস্তবতা ছিলো। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যৌক্তিক এ দাবিকে নিঃসন্দেহে অর্থবহ করেছে এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হলো। জ্ঞানার্জনের ঠিকানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবারো জ্ঞান বিতরণে মুখরিত হোক। শিক্ষকদের সুন্দর নির্দেশনায় শিক্ষার্থীরা এগিয়ে চলুক। বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পড়াশুনায় মনোযোগী হোক। দেশ এবং জাতির কর্ণধার হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলুক। কথা ও কাজে সুনাগরিক এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে নিজেদেরকে তৈরি করুক। এটাই একান্ত প্রত্যাশা।

[লেখক: সাবেক ইনচার্জ, শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা নাজিরেরগাঁও শাখা, সিলেট।]

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *