সিলেটে পাল্টে যাচ্ছে নৌকার প্রার্থী, ক্ষোভ

সিলেট

সিলেটে তৃণমূলের ভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করে পাল্টে দেয়া হচ্ছে নৌকার প্রার্থী। প্রায় প্রতিটি উপজেলায়ই এমন ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে তৃণমূলে। নৌকার প্রার্থী পাল্টে যাওয়াকে কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছেন না তৃণমূলের নেতারা। এজন্য প্রকাশ্য মুখ খুলেছেন কেউ কেউ।

তৃণমূলের নেতারা অভিযোগ করেছেন; টাকার বিনিময়ে প্রার্থী পাল্টে দেয়া হচ্ছে। এতে রয়েছে লন্ডনের কানেকশনও। লন্ডন থেকে অনেকেই নৌকার টিকিট কনফার্ম করে সিলেটে এসে প্রার্থী হচ্ছেন। সিলেট আওয়ামী লীগের নেতারা এবার নৌকার প্রার্থী বাছাই করতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া বেছে নেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্য রয়েছে; জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা প্রতিটি উপজেলায় গিয়ে সরাসরি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতাদের ভোটে নৌকার প্রার্থী বাছাই করছেন। বাছাই শেষ হওয়ার পর তারা পৃথকভাবে উপজেলা ও জেলা নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে প্রতিটি ইউনিয়নে রিপোর্ট পর্যাক্রমে সাজিয়ে ৩ জনের তালিকা কেন্দ্রের কাছে প্রেরণ করেন।

কিন্তু অনেক ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী বদলে যাচ্ছে। পরিচিতি কম ও তৃণমূলের ভোটে পরাজিত প্রার্থী এবং অন্য দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করা নেতাকর্মীরা হয়ে যাচ্ছেন নৌকার প্রার্থী। কয়েকটি উপজেলার পর্যায়ক্রমে একের পর এক ঘটনা ঘটায় এ নিয়ে তোলপাড় চলছে আওয়ামী লীগে। অনেকেই কেন্দ্রের নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে এ ব্যাপারে নালিশও করে আসছেন। চতুর্থ ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারে। এ দু’টি উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী বদল হওয়া নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে।

স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন- বিয়ানীবাজারের দুবাগ ইউনিয়নে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছিলেন পলাশ আফজাল। কিন্তু মনোনয়ন পেয়েছেন আব্দুস সালাম। তিলপাড়া ইউনিয়নে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছিলেন আহবাবুর রহমান খান। মনোনয়ন পেয়েছেন এমাদ উদ্দিন। একইভাবে মোল্লাপাড়া ইউনিয়নে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হন আশফাক আহমদ। এ ইউনিয়নেও প্রার্থী বদল করে শামীম আহমদ নামের একজনকে দেয়া হয়েছে। তিনটি ইউনিয়নে তৃণমূলের ভোটকে অগ্রাহ্য করে প্রার্থী দেয়ার কারণে তোলপাড় চলছে। প্রার্থী পাল্টানোর ঘটনায় উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লবের একটি ভিডিও বার্তা তৃণমূলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে।

গোলাপগঞ্জের দু’টি ইউনিয়নেও ঘটেছে একই ধরনের ঘটনা। এর মধ্যে বাদেপাশা ইউনিয়নে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছিলেন আলিম উদ্দিন বাবুল। পরবর্তীতে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে বর্তমান চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদকে।

বুধবারি বাজার ইউনিয়নে তৃণমূলের প্রার্থী পাল্টানোকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ ইউনিয়নে তৃণমূলের মতামতে ১৪ ভোট পেয়ে প্রথম হন ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি হালিমুর রশীদ রাপু। চার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন যুবলীগ নেতা শাহীন আহমদ ও এক ভোট পেয়েছিলেন আব্দুর রহমান ফারন।

কিন্তু এই ইউনিয়নে নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন ১ ভোট পাওয়া আব্দুর রহমান ফারন। প্রার্থী পাল্টে দেয়াকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না স্থানীয় নেতারা।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আলী আহমদ জানিয়েছেন- আব্দুর রহমান ফারনের এক ছেলে লন্ডন বিএনপি’র বড় নেতা। তার আরেক ছেলে বিএনপি নেতা। সে জাতির পিতাকে নিয়ে কটূক্তি করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

তৃতীয় ধাপে ২৮শে নভেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার ১৬ ইউনিয়নে ভোট। এই নির্বাচনে তৃণমূলের ভোটের জয়ী হওয়া প্রার্থীদের পরিবর্তন করা হয়েছে। সিলেটের গোয়াইনঘাটের লেঙ্গুরা ইউনিয়নে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছিলেন যুবলীগ নেতা গোলাম কিবরিয়া রাসেল। কিন্তু নৌকা পেয়েছেন মুজিবুর রহমান। তেমনি ভাবে ডৌবাড়ী ইউনিয়নে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছিলেন নিজাম উদ্দিন। সেখানেও প্রার্থী পরিবর্তন করে নৌকার দেওয়া হয় সুভাস দাসকে। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে তৃণমূলের মতামতকে অগ্রাহ্য করে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।

মোগলাবাজার ইউনিয়নে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছিলেন ফখরুল ইসলাম শায়েস্তা। সেখানে প্রার্থী পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. ছদরুল ইসলামকে। তেমনিভাবে লালাবাজার ইউনিয়নে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছিলেন মুহিত আহমদ। পরে সেখানে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে তোয়াজিদুল ইসলামকে।

জালালপুর ইউনিয়নে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হন মোস্তান চৌধুরী। কিন্তু নৌকা পেয়েছেন ওয়েস আহমদ। কুলাউড়ার ভাটেরা ইউনিয়নে গত নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হয়ে চেয়ারম্যান হয়েছিলেন উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান জেলা যুবলীগের সিনিয়র নেতা একেএম নজরুল ইসলাম।

কিন্তু নৌকার নির্বাচিত থাকার পরও এই ইউনিয়নে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে প্রবাসী নেতা জুবায়ের সিদ্দিকী সেলিমকে। তবে মাঠ ছাড়েননি একেএম নজরুল ইসলাম। তার সমর্থকরা জানিয়েছেন- যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে এক নেতা লন্ডনে টাকার বিনিময়ে টিকিট কনফার্ম করে দিয়েছেন। এটি ভোটের মাঠে চাউর হওয়া মাত্র তোলপাড় হচ্ছে। তৃণমূলের নেতারা জানিয়েছেন- তৃণমূলের ভোটকে অগ্রাহ্য করে প্রার্থী দেওয়ায় বিদ্রোহ বেশি হচ্ছে। আর বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কারণে নৌকার নিশ্চিত জয় স্বতন্ত্র ব্যানারে প্রার্থী হওয়া জামায়াত-বিএনপি’র প্রার্থীরা নিয়ে যাচ্ছে। এতে দিন শেষে ক্ষতিগস্ত হচ্ছে আওয়ামী লীগও। এছাড়া- অনেক এলাকায় স্থানীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যানরা বিতর্কিত ভূমিকা পালন করায় ইউনিয়ন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ে বিভক্ত ও কোন্দল ছড়িয়ে পড়ছে।

এদিকে- চতুর্থ দফা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থিতা নিয়ে বিয়ানীবাজারের উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম পল্লবের বক্তব্য সংবলিত একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে পল্লব জানিয়েছেন; ‘নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ক্যান্ডিডেট সঠিক জায়গায় দিতে পারি না। সেজন্য নৌকা ফেল করে। আপনারা ক্যান্ডিডেট বাছাই যদি সঠিক মাত্রায় হয় তাহলে আমি মনে করি কোনো জায়গায় নৌকা হারার সম্ভাবনা নেই। নৌকা শুধুমাত্র হারে ক্যান্ডিডেট বাছাইয়ের কারণে।’

তিনি বলেন, ‘নৌকা পাওয়ার পর যে ফেল করবে; তাকে সারা জীবনের জন্য বহিষ্কার করা হোক, যেমন বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। এতে আমিও যদি নৌকা পাওয়ার পর ফেল করি, তাহলে ওই যোগ্যতা আমার নেই।’

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী জানিয়েছেন; ‘আমাদের কাজ হচ্ছে গনতান্ত্রিকভাবে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কেন্দ্রে তালিকা পাঠানো। সেটি আমরা স্বচ্ছতা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে যাচ্ছি। এখন কেন্দ্র থেকে যাকেই প্রার্থী দেওয়া হচ্ছে আমরা তার পক্ষে কাজ করছি।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে নির্বাচনে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এখন কেন্দ্র কী কারণে প্রার্থী পরিবর্তন করে সেটি তার কাছে বোধগম্য নয় বলে জানান।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *