সাম্প্রতিক ষড়যন্ত্র এবং আমাদের করণীয়

মুক্তমত

সদ্যই ফিরেছি সিলেট থেকে। কিছুদিন যাবত প্রতিমাসে একবার সিলেটে গিয়ে রোগী দেখাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। ‘নাড়ির টান’ বলে বাংলায় একটা কথা আছে। এই টানাটানিটা সম্ভবত পঞ্চাশ পেরুলে আরও বেশি করে অনুভূত হয়। নিজের অভিজ্ঞতায় অন্তত তাই ধারণা।

কারণ, আগে কালেভদ্রে ‘সিলেটি কুট্টি’ সিলেটে বেড়াতে যেতাম ঠিকই’ কিন্তু ইদানীং মাসে অন্তত একবার ওসমানী বিমানবন্দরে পা না রাখতে পারলে বুকটা কেমন যেন খালি খালি মনে হতে থাকে। এবারে যাওয়ার একটা বাড়তি কারণও অবশ্য ছিল। সিলেটের প্রগতিশীল, স্বাধীনতার পক্ষের সুশীলদের সম্মানে একটা ইফতার আয়োজনের দারুণ সুযোগও পেয়েছিলাম। রাত তখন একটার মতো হবে। সামনের রাস্তা দাপিয়ে হর্ন বাজাতে বাজাতে শহর কাঁপিয়ে ছুটে গেল একটা ফ্ল্যাগ ওড়ানো জিপ। গতিবেগ ঘণ্টায় আশি তো হবেই। পেছনে একই ভঙ্গিমায় উর্ধশ্বাসে ছুটছে আরও দুটি গাড়ি। সিলেট বিভাগ থেকে যাদেরকে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উড়িয়ে চলার সম্মান দিয়েছেন তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই কমবেশি পরিচয় আছে। এমনভাবে হর্ন বাজিয়ে, শহর দাপিয়ে ছুটে চলাটা তাদের কারোর চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যায় না। গাড়িতে ওড়ানো ফ্ল্যাগটাও জাতীয় পতাকা নয়। সিলেট শহরে এত রাতে কোন ফ্ল্যাগধারীর রক্তে এত তেজ! এর রহস্যটা অবশ্য উদ্ধার হলো দ্রুতই। সঙ্গে ছিলেন একজন সংস্কৃতিকর্মী। জানালেন তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মহোদয়। ক্রমাগত জনগণের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হতে হতে বিএনপি নামক একদা পরাক্রমশালী রাজনৈতিক সংগঠনটির জনপ্রতিনিধিত্বকারী, এখন মূলত ইউনিয়ন পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। সেই ইউনিয়নের গ-ি ছাড়িয়ে সারাদেশে তাদের যে দু’চারজন হাতেগোনা জনপ্রতিনিধি আছেন তিনি তাদের অন্যতম। সিলেট থেকে ফিরে আসার পরপরই তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন পথের ধারে পার্ক করে রাখা ভ্যানের চালককে গাড়ি থামিয়ে চাবকানোর ছবির কল্যাণে। অবশ্য তিনি বলেছেন, বিষয়টি তেমন নয়, শুধুই শাসন। মানুষের কাছে যা ‘অপশাসন’ সেটাই যে এখনও তাদের কাছে ‘শাসন’ দলটির শীর্ষস্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির আচার-আচরণে সেটাই আরও একদফা স্পষ্ট হয়ে গেল।

দলটি আবারও ষড়যন্ত্র শুরু করেছে আগামীতে ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য। এই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি নিয়ে সরগরম দেশীয় রাজনীতি। ম্রিয়মাণ কোভিড প্যান্ডেমিক, ততোধিক ম্রিয়মাণ পাকিস্তানের ইমরান খান নিয়াজি এবং তারও চেয়ে বেশি ¤্রয়িমাণ শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে ছাপিয়ে এই আলোচনাই এখন ইফতারের টেবিলে ঠা-া শরবতের গ্লাসে ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। এই নিয়ে এমনকি বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীও। সবাইকে আবারও সতর্ক করেছেন ষড়যন্ত্রকারীদের চোখে চোখে রাখার ব্যাপারে। স্পষ্টতই হতাশাও ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক অন্য আরেক বক্তব্যে।

বর্তমান অবস্থায় সুস্থ রাজনীতির সঙ্কটের প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে গিয়ে দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতির ব্যাপারে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, বিরোধী রাজনীতিতে রাজনীতিহীনতা আর অপরাজনীতির আধিক্যের বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক সময় খেদ প্রকাশ করেছেন ভীনদেশী কূটনীতিকরাও। বিএনপির এক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে তার বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের জন্য সাংবাদিক সম্মেলন করে উষ্মা প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত, যা একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। প্রায় একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফররত ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূতও স্পষ্টতই বলেছেন, বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রতি প্রশংসনীয় হলেও তা বিনষ্টের জন্য সক্রিয় রয়েছে একটি চক্র। আর এই চক্রটি যে কারা সেটি তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কদিন আগেই থলের বেড়াল বেরিয়ে আসার পর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, ‘নিজেদের নাক কেটে সরকারের যাত্রাভঙ্গ’ করতে দিয়ে তারা ‘বাংলাদেশবিরোধী লবিংয়ের’ জন্য মার্কিন মুলুকে পয়সা দিয়ে লবিস্ট ফার্ম পর্যন্ত নিয়োগ করেছে।

ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় একদিন সেনানিবাস থেকে যে দলটির জন্ম হয়েছিল তারা যে সর্বদা ষড়যন্ত্রই করবে, সেটা অবশ্য প্রত্যাশিত। অতীতে তারা যখন ক্ষমতায় ছিল বা ছিল ক্ষমতার বাইরে তারা কখনই তাদের এই কুৎসিত চরিত্রটি বর্জন করেনি। কাজেই এখনও তাদের কাছ থেকে নতুন কিছুু প্রত্যাশিত নয়। তারপরও তাদের অপরাজনীতি হালের রাজনৈতিক হেডলাইনগুলোকে ডমিনেট করছে একটা কারণে, আর তা হলো আরেকটি জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। এবারের এই নির্বাচনটি বিএনপি নামক এদেশে পাকিস্তানপন্থীদের প্ল্যাটফর্মটির জন্য অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন। সরকারের একের পর এক গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করবে নির্বাচনটির আগে এবং পরে। আর এসবের সুফলও ভোগ করতে শুরু করবে বাঙালী আর বাংলাদেশ বর্তমান সরকারের পরবর্তী মেয়াদকালেই। কাজেই এরপর এই সরকারের ভিতটা যে কংক্রিটে ঢালাই করা হয়ে যাবে সেটা এই অপশক্তি ভালই বুঝতে পারছে। কাজেই এবারের নির্বাচনটি তাদের জন্য ‘ডু অর ডাই’ নির্বাচন। অথচ দুর্নীতির ও চুরির মামলায় দ-প্রাপ্ত হয়ে এই নির্বাচনেও অংশ নিতে পারছেন না দলটির দুই শীর্ষ নেতার কেউই, যারা আবার দলটির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল সাহেবের পরিবারের সদস্য। কাজেই দলটি আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতৃত্বের পাশাপাশি ইমেজ সঙ্কটেও যে হাবুডুবু খাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। আর এ কারণেই রাজনীতির মাঠ ছেড়ে অপরাজনীতির মাঠে ইদানীংকালে তারা এত বেশি সক্রিয় ও অপতৎপর। এই অশুভ চক্রটি যদি কোনভাবে ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে তবে তাদের সেই দুঃশাসন যে কেমন হবে এই লেখার শুরুতে একজন মেয়রের সাম্প্রতিক দুটি ছোট্ট উদাহরণই বোধ করি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। অতএব, ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াটা এখন আমাদের সবার স্বার্থেই অবশ্য জরুরী কর্তব্য।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.