সাংগঠনিক কর্মে খেয়াল নেই, আচার অনুষ্ঠানে ব্যস্ত নেতারা

রাজনীতি সিলেট

সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই পিছিয়ে সিলেট আওয়ামী লীগ। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ১৫ মাসের ভিতরেও সাংগঠনিক সু-খবর নেই দলটিতে। দলীয় কর্মসূচী চলে দো’আ মাহফিলের মধ্য দিয়ে। এমনকি মহান স্বাধীনতা দিবসেও কর্মসূচীতে কোনো চমক দেখাতে পারেনি দলটি। তাছাড়া জেলা ও মহানগরে ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংও হয়েছে হাতেগোনা। বর্ধিত সভা হয়নি জেলা ও মহানগরে। এর ফলে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বাড়ছে দূরত্ব। জেলা এবং মহানগরে বিভিন্ন ইউনিটে নেতাকর্মীদের এই নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও কেউই প্রকাশ্যে কথা বলছেন না।

তবে আওয়াজ না করাটাকে দলের জন্য ক্ষতিকর বলেও মন্তব্য তাদের। অভিযোগ মানতে নারাজ জেলা ও মহানগর নেতৃবৃন্দ। তাদের দাবি-কার্যক্রম চলছে এমনকি নেতাকর্মীদের সাথেও জেলা ও মহানগরের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে।

২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর নগরীর আলিয়া মাদরাসা মাঠে একযোগে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের বহুল প্রত্যাশিত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে মহানগরে সভাপতি পদে চারজন ও সাধারণ সম্পাদক পদে ১২ জন এবং জেলায় সভাপতি পদে সাতজন ও সাধারণ সম্পাদক পদে নয়জন প্রার্থী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উপস্থিতিতে সম্মেলনে সমঝোতার ভিত্তিতে উভয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়।

সম্মেলনে ঘোষিত কমিটিতে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হন মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক হন অধ্যাপক জাকির হোসেন। অন্যদিকে জেলায় সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রের নির্দেশে জেলা ও মহানগর কর্তৃক প্রস্তাবিত কমিটি পাঠানো হয় কেন্দ্রে। তবে প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে অনুমোদন বিলম্বিত হয়। প্রস্তাবিত কমিটি জমাদানের চার মাস পর ২০২১ সালের ৮ জানুয়ারি সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লুৎফুর রহমান মারা গেলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন দলের সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরী। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শফিকুর রহমান চৌধুরীকে জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

এদিকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পর উভয় সংগঠনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত দলীয় বড় কোন কর্মসূচি চোখে পড়েনি। জেলার আওতাধীন উপজেলা কমিটিগুলোতে রয়েছে নানা কোন্দল। গেল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের ফলাফল বিশ্লেষন করলে বিষয়টি আরও স্পস্ট হয়ে উঠে। জেলার আওতাভুক্ত অধিকাংশ ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রাধান্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও দিন শেষে অধিকাংশ বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করেন। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের ক্ষোভও ছিল অন্তহীন। প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ে ব্যর্থতা, দলের ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করার বিষয়টিও তৃণমূল কর্মীদের অভিযোগে উঠে আসে।

সুখবর নেই মহানগর কমিটিতেও। দল গোছানোর কর্মকান্ডেও গরজ লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা নেতাদের মধ্যে। সিলেট সিটি করপোরেশেন নির্বাচনের আগেই প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন অনেকেই। সিসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মেয়র হতে ইচ্ছুক দলের মহানগর শাখার অন্তত ৭ নেতার নাম আলোচিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছেন দলের সিনিয়র সহ সভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন, সহ সভাপতি ফয়জুর আনোয়ার আলাওর, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এটি এম জেবুল হাসান ও আজাদুর রহমান আজাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আরমান আহমদ শিপলু, সদস্য প্রিন্স সদরুজ্জামান চৌধুরী। মহানগর শাখা থেকে মেয়র হতে ইচ্ছুক আরও একাধিক প্রার্থী সরব রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন ওয়ার্ড শাখার নেতাকর্মীরা।

ইতোমধ্যে সকলেই নির্বাচনী প্রচারণাও শুরু করেছেন। উঠোন বৈঠক, নববর্ষের শুভেচ্ছা, ইফতার মাহফিলে অংশ গ্রহণসহ প্রতি জুম্মাবারে নগরীর বিভিন্ন মসজিদে মসজিদে নামাজে অংশ নিচ্ছেন। ঘরোয়া প্রচারণাকালে মহানগরসহ ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের যুক্ত করছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের যুক্ত করা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়েছেন অনেকেই। তবে সবচাইতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রয়েছেন দলের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

গেল ইউপি নির্বাচন এবং উপজেলা পর্যায়ে কোন্দল বিষয়ে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক জগলু চৌধুরী বলেন, মনোনয়ন প্রক্রিয়াটি সম্পুর্ন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। যেখানে প্রতি ইউনিয়নে ওয়ার্ড নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে তালিকা বাছাই করা হয়। বাছাইকৃত তালিকা ঢাকায় প্রেরণ করে জেলা কমিটি। তালিকা চূড়ান্ত করেন দলের মনোনয়ন বোর্ড। সুতরাং মনোনয়ন নিয়ে কোন ফায়দা হাসিলের সুযোগ নেই। উপজেলা পর্যায়ে কোন্দলের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, যথাসময়ে সম্মেলন না হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। গেল ইউপি নির্বাচনে এর কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে দলের সাংগঠনিক ভিত আরও মজবুত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

নগরীর ১৫ নং ওয়ার্ড কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সরওয়ার আহমদ চৌধুরী আবদাল বলেন, ‘সাংগঠনিকভাবে একটা স্তবিরতা আছে। কারণ বর্ধিত সভা না হলে ওয়ার্ড পর্যায়ের সমস্যাগুলো তোলে ধরা যায় না।’ তিনি বলেন, সিসিক নির্বাচন সমাগত। জাতীয় নির্বাচনও বেশি দূরে নয়। এই অবস্থায় ভেদাভেদ ভুলে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, একটি বিষয় সবাইকে মাথায় রাখতে হবে, দেশের উন্নয়ন চাইলে আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই।

১৫ মাসেও দলের বর্ধিত সভা না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন দলের মহানগর সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বর্ধিত সভা না হলেও ওয়ার্কিং কমিটির সভা হয়েছে। তাছাড়া, নগরীর প্রতিটি ইউনিটে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। আগামী সিসিক নির্বাচনে দলীয় কোন্দলের আশঙ্কার বিষয়টি কিভাবে দেখছেন-এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যারা দলকে ভালোবাসে এবং আদর্শকে ভালোবাসে তাঁরা ব্যক্তিকে নয়, দলীয় প্রার্থীকেই মনোনীত করবে। আর সেটা যদি কেউ করে না, বুঝতে হবে তিনি হাইব্রিড।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.