শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন- আল-আমিন

সাহিত্য

কুয়াশা মোড়া শীতের সকাল। চোখ বুজলেই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে গ্রামের দৃশ্য। কনকনে শীতে জবুথবু একটি গ্রামের ভোর। আমি খুব কাছ থেকেই গ্রাম দেখেছি, শৈশবে আমি গ্রামে শীতের এক আলাদা অনুভূতি অনুভব করেছি। আমি দেখেছি কুয়াশায় আচ্ছন্ন শীতের সকালে বাড়ির পশ্চিম পাশের বিশাল পুষ্পিত সরিষাখেত, সবুজ রঙ ধরা গমখেত, টমেটো, কাচামরিচসহ নানা ধরনের সবজিখেত। বাড়ির দক্ষিণ দিকে পুকুরপাড়ের খেজুর গাছে নানু মিয়ার মাটির কলসে খেজুরের রস সংগ্রহের দৃশ্য আমার চোখ এড়াতে পারেনি। আমি দেখেছি শীতের সকালে গ্রামের উঠোনের একপ্রান্তে জলন্ত উনুন। সে আগুনের কাছে উনুনের ধার ঘেষে বসে থাকা বাড়ির ছেলেবুড়ো। বাড়ির গৃহিণীর হাতে ঢাকা হাড়ির উপরে কাপড়ের ভাজে ভাজে উঠছে চালের গুড়োর সাথে নতুন খেঁজুর গুড় আর নারকেল কুঁড়ে দেওয়া ধোঁয়া ওঠা ভাপাপিঠা। এরপর চুলা থেকে ধোঁয়াসহ ভাপাপিঠা হয়ে একেকবার একেকজনের হাতে পরম মমতায় ও ভালোবাসার বাঁধনে গ্রামের চিরচেনা শীতকাল। কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ ভেদ করে পূর্ব দিকে সূর্যের আলো উকি দিয়ে ফুটে ওঠা মিষ্টি রোদও আমি দেখতে ভুলিনি। খেজুর গাছ থেকে খেজুর রস নামানোর সঙ্গে সঙ্গে সে রসের গন্ধে চারদিক মৌ মৌ গন্ধে আমোদ করার ঘ্রাণ আমি নিয়েছি বহুবার। দূর্বাঘাসের মাথায় বিন্দু বিন্দু কুয়াশার শিশির ফোটা কলমির ডগা আর বেগুন গাছের মাথায় জমে থালা এই শিশির বিন্দুকে দেখে মনে হয় যেন কিশোরীর নাকফুল।

শীতের সকাল মানেই নতুন পিঠার স্বাদ নেওয়া। শীত এলে তাই পিঠা বানানো হয় আনন্দ নিয়ে। ভাপাপিঠার সাথে, চিতই, পাকান, ম্যারা, ফুলপিঠা, পাটি সাপটা, পুলি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তবে চিতই বা রসপিঠা খাওয়া সবচেয়ে বেশি মজার। শীতের সময় গ্রামাঞ্চলে গেলে দেখা যায় বাড়িতে বাড়িতে পিঠা বানানোর ধুম। শীতে খেজুর রসের পায়েস এক মজাদার খাবারও তৈরি হয়। শীতের সন্ধ্যায় সন্ধ্যেরস খাওয়ার মজাই আলাদা। বাংলাদেশে পিঠাপুলির অবস্থান অন্যান্য মজাদার খাবারের শীর্ষে। পিঠার খাঁজে খাঁজে ফুটে ওঠে নিবিড় শিল্প নৈপুণ্য। পাটিসাপটা, দুধপুলি, নারিকেলী, ভাপা, চিতই নকশীপিঠা ইত্যাদি। এছাড়া দুধচিতই, বড়াপিঠা, ক্ষীরপুলি, চন্দ্রপুলি প্রভৃতি পিঠারও বেশ প্রচলন রয়েছে। বাঙালির খাদ্য রুচিকে বাস্তবিকই একটি স্বাতন্ত্র্যরূপ দিয়েছে শীতকালের খেজুরের রস। নতুন ধানের পিঠা পায়েস নিয়ে সকালের মিষ্টি রোদে পিঠ ঠেকিয়ে রসনা তৃপ্তি শীতের অনুভূতি খেজুরের মিষ্টি রসের হাঁড়িতে পাটকাঠি ডুবিয়ে গ্রামের ছেলেমেয়েদের চুকচুক করে রস খাওয়ার দৃশ্য শীতের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। খেজুরের রস, পাটালি গুড়, কোঁচাভর্তি মুড়ি, শীতের পিঠা পায়েস, খড় পাতার আগুন পোহানো, গমেরখেতে পাখি তাড়ানো, কম্বলের উত্তাপ, কুয়াশা ঢাকা ভোরে ও সন্ধ্যায় আনন্দের শীত জনজীবনকে রাঙিয়ে তুলে। শীতের মিঠে রোদ, কুয়াশার চাদর, উঠোনের কোণে মাটির চুলায় রান্না, চুলার পাশে বসে বসে হাতের তালু গরম করে নেয়া, চায়ের কাপের সাদাটে ধোঁয়া, হলুদের ডালি বিছানো সরষেরখেত, হাট বাজারে ক্যাম্পাছার বকুল ভাইয়ের মজমা, গ্রামের স্কুলমাঠে গানে মাতোয়ারা এসব গল্প এই শীতকে ঘিরেই। এই শীতেই গ্রাম শহরে এলাকা সমাজ সংগঠন মসজিদ ও মাদ্রাসা ভিত্তিক মুসলমানদের তাফসীর ওয়াজ মাহফিলও এক ধরনের আনন্দ উৎসব হয়ে থাকে। মুসলমানেরা ওয়াজ মাহফিল ও তফসিরুল কোরআনের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বাস, ইমান ও আকিদার কাজ করে থাকেন।

শিশিরে নূপুর পায়ে শীত সমাগত হয় বাংলার মাঠে। তাই শীত এলে কুমড়োর হলুদ ফুল হাসে। দূর্বাঘাস শিশিরের নূপুর পায়ে হাঁটে। শীতের ঠান্ডা বাতাস আর শিশির ভেজা ঘাসের ডগায় মুক্তোর মতো দানা সকাল-সন্ধ্যার কুয়াশার চাদর মুড়ে দেয় চারপাশ। ভোরের কাঁচা রোদ, হিমেল হাওয়া প্রাণে তুলে শিহরণ। পৌষ-মাঘ শীতকাল হলেও অগ্রহায়ণ থেকে শীতের সূচনা। এসময় প্রকৃতিকে আমরা নতুন করে আবিষ্কার করি। কুয়াশায় আচ্ছন্নতা ঘিরে রাখা চারপাশে দিনের সূর্য ঢেলে দেয় মায়াবি রোদ। রাতের আকাশে রূপালি তারা খচিত শুভ্রতা ছড়িয়ে পড়ে। চাঁদের ধবধবে সাদা জোছনার পূর্ণিমা চাঁদ হয়ে ওঠে শিশির ধোয়া রূপার থালা। শীতের শনশন শব্দ আর পাখিদের কিচির মিচিরে মুখর থাকে জনপদ। হৃদয়ে আসে প্রেমের বার্তা।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে শীত পঞ্চম ঋতুতে অবস্থান। শীতকাল অন্য ঋতুগুলোর চেয়ে একেবারেই আলাদা। গ্রীষ্মের মাঠঘাট ফাটা প্রখর তাপ, বর্ষায় নূপুরের শব্দে অবিরল বারিধারা, শরতের স্নিগ্ধতা ও স্বচ্ছতা পেরিয়ে আসে ঋতুরাণী হেমন্ত। নবান্নের ঋতু হেমন্তের হাত ধরেই আগমন ঘটে শীতের। মাঠের সোনালি ধান গোলায় ভরার পর আনন্দে মেতে থাকা মানুষের শরীরে লাগে শীতের কাঁপন। শীতের সৌন্দর্য্য বিরাজ করে সরিষা খেতেও। মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফুটে থাকা হলুদ সরিষার ফুল যেন বিছিয়ে রেখেছে হলুদ ফুলের চাদরে। আর এই ফুল ও কলিদের উপর উড়ে চলা রঙ্গিন প্রজাপতি আর মৌমাছিদের নৃত্য মন কেড়ে নেয় কিশোরীর। ভোরবেলায় মটরশুঁটি আর সবুজ ঘাসের ডগায় ঝুলে থাকে শিশির বিন্দু আর সকালের রোদের আলো ছড়ানো নানা রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যায় পুরো দিন। কনকনে শীতে গ্রামের চা দোকানে ভোর হতে জমে আড্ডা। কথা আর গাল গল্পে যে যার মতো শীতের চাদর, সোয়েটার গায়ে দিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠেন গা হেলিয়ে নিজের মতো করে।

এ ঋতুতে শুকিয়ে যায় খাল বিলের পানি। কোথাও হাঁটুজল, কোথাও খটখটে চর জাগে। তাই গ্রামের কিশোর কিশোরীরা মেতে ওঠে অল্প পানিতে মাছ ধরার উৎসবে। সেইসঙ্গে খাবারের খোঁজে খালবিল আর মাঠেঘাটে ঝাঁকে ঝাঁকে নামে সাদা বকের ঝাঁক। সাদাফুলের মত বসে থাকা বকের শুভ্রতাও শীতের এক অপরূপা দৃশ্য তৈরি করে দেয়। শীতের বাতাসে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনির সাথে দেখি গাছের পাতাগুলো বিবর্ণ রূপ ধারণ করে। একটা সময়ে কিছু গাছের পাতা ঝরে পড়ে। অন্যান্য গাছের পাতাগুলো ধুলাবালি মেখে কদর্য রূপ ধারণ করে। সকল ঋতুরই যেমন আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে তেমনি শীতের বৈশিষ্ট্য এই সৌন্দর্য। কুয়াশা মোড়া নিঝুম রাতে আর সকালে পুকুরের পানি ধোঁয়া ছড়িয়ে আসে মিষ্টি রোদ । তখন কুয়াশা ভেদ করা রূপালী রোদ গাছের পাতার উপর চিকচিক করে। রাতে টিনের উপর শিশির ঝরে। নদীর পানি শুকিয়ে যায়। শুকনো পুকুর ডোবার তলায় কিশোরীর বউছি গোল্লাছুট আর ছেলেরা হাডুডু আর দায়রাবান্দা খেলা জমে ভীষন ভালোবাসায়। কেউ খেলে কানামাচি। কেউ গায় বাউল সাধকের গান একতারা তুই বলরে কথা বল। এই শীতের সকালে ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে মক্তবে আরবি দোয়া নামাজের মাসায়ালা মাসায়েল পড়তে যাওয়ার দৃশ্যও চোখে পড়ে।

নগর জীবনে শীতের আমেজ আলাদা। গ্রামে প্রতি পদক্ষেপে আলাদা করে অনুভব করা যায় শীত ঋতুর তাৎপর্যে। বাংলার পথে পুকুর পাড়ে রাস্তার পাশে তাকালেই চোখে পড়ে খেজুরগাছের আগায় ঝুলছে ছোট্ট রসের হাড়ি। আর ফসলের মাঠজুড়ে সোনালি আভায় সকাল সন্ধ্যায় হিম হিম কুয়াশা। শীতে গাছ থেকে নামিয়ে কাঁচারস আর উনুনে জ্বাল দেওয়া গরমরস এদুইয়ের স্বাদই অতুলনীয়। আর রসে ভেজানো রসের পিঠাও সবার প্রিয়। এসময় গ্রামের সন্ধ্যাকাশে উড়ে চলে অতিথি পাখির দল। পাখিদের এই কিচির মিচির শব্দ শীতের প্রকৃতি দোল দিয়ে যায় মনকে। শীতের দিনে ভোরে ঘুম ভাঙ্গলেও বিছানা ছেড়ে উঠতে মন চায় না । বাছ করা লেপ কাঁথা কম্বলের ভিতর এক অসম্ভব মজা অনুভব হয়। তুলোর ফাঁকে ঢুকে থাকা রোদের গন্ধ এসময় ঘুমের দীর্ঘতা বাড়িয়ে দেয় অনেক।

শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং ভাবনার সময়ও এই শীত ঋতু। এই সময় যাত্রা ও পালা গানের শিল্পীরা থাকে গ্রামের পথে প্রান্তরে। সুফি ও বাউল ভাব দর্শনে বিশ্বাসীরা মেতে ওঠেন নানা অনুষ্ঠানে। বিভিন্ন মরমী সাধকের মাজার ও খানকা ঘিরে শুরু হয় ওরস ও বাউলমেলা। এই সময়টাতে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা স্বচ্ছল থাকার কারণে গ্রামে গ্রামে চলে বিয়ে, সুন্নতে খতনার আয়োজন। এসবের মাধ্যমে বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে যোগ হয় নতুন মাত্রা। হাটবাজারগুলো ভরে ওঠে সবুজ সতেজ শাক-সবজিতে।

বছরের অন্যান্য সময় বাজারে টাটকা সবজি কম পাওয়া গেলেও শীতকালে বাজারে প্রচুর পরিমাণ শীতকালীন শাক-সবজি পাওয়া যায়। এ সময় ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, গাঁজর, শীম, বেগুন, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, করলা, আলু, বরবটিসহ শীতকালীন সবজিতে ভরপুর থাকে বাজার। পালং শাক, মুলা শাক, লাল শাকসহ নানা জাতের টাটকা শাকও পাওয়া যায় বাজারে। প্রকৃতিও শীতের আমেজ শিশিরভেজা এই সময়ে প্রকৃতিতে সৌরভ ছড়ায় শীতের ফুল। শীত মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে গোলাপ আর গাঁদা ফুলের চাষ হয়। গ্রামের খেতে শোভা পায় গোলাপ আর গাঁদার বাগান। আর নার্সারিগুলো শীতকালীন ফুলে রঙিন হয়ে উঠে। শীতের শিশির সময়ে দেশি ফুলের মধ্যে মল্লিকা, ডালিয়া, নয়নতারা, মাধবীলতা অন্যতম। দেশি ফুলের পাশাপাশি বিদেশি ফুলের মধ্যে শীতের প্রকৃতি রাঙিয়ে তোলে নানা বিচিত্র ফুল। এসময় জীবনের সন্ধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নানা প্রজাতির পাখি ক্লান্তিহীনভাবে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে নির্মল সুখ আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে এ বাংলায়। শীত মৌসুম শুরু হলেই অতিথি পাখির আনাগোনায় মুখরিত হয়ে উঠে বাংলার নদনদী, খালবিল, হাওর, ঝিল, জলাশয় ও বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। এ সময় অতিথি পাখির গুঞ্জনে গ্রাম বাংলা জেগে ওঠে নতুন রূপে। পাখিরা প্রতি বছর অগ্রহায়ণের শেষে ও পৌষ মাসের শুরুর দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে আমাদের দেশে আসতে শুরু করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসে বলে এই পাখিগুলোকে অতিথি পাখি বলা হয়। শীতজুড়েই থাকে অতিথি পাখিদের বিচরণ। আমাদের দেশে শীত মৌসুম শুরু হতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বার্ষিক শিক্ষা সফরের আয়োজন হয়ে থাকে। আর শীতের সময়ে গ্রামে গ্রামে চলে পিকনিক আর খাওয়ার ধুম। গ্রামের বিভিন্ন বয়সী ছেলেমেয়েরা মাইক বাজিয়ে হাওরর কিংবা মাঠে পিকনিক উৎসব করে থাকে আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা চড়ুইভাতিতে মেতে ওঠে।

লেখক:
কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.