মুখ ও মুখশ্রী-মো. আব্দুল হামিদ।

মুক্তমত

 

আপনার দুজন সহকর্মী বা সহপাঠীর কথা ভাবুন। একজন সাক্ষাতে, ফেসবুক পোস্টে কিংবা ফোনালাপে সুযোগ পেলেই আপনার প্রশংসা করে। এমনকি মাঝেমধ্যে অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রেও আপনার রূপ ও গুণকীর্তন করে।

আরেকজন সেভাবে আপনার প্রশংসা করে না, অর্থাৎ বাকপটু নয়। তবে আপনাকে সার্বিক বিষয়ে সহযোগিতা করে, আপনার ভালো-মন্দকে সত্যিই গুরুত্ব দেয়। এবার বলুন, ওই দুজনের মাঝে কে আপনার ‘পছন্দের’ ব্যক্তি বলে গণ্য হবে?

আমাদের সমাজে অধিকাংশ মানুষ প্রথমে বর্ণিত ব্যক্তিকে পছন্দ করে। হয়তো শুভাকাঙ্ক্ষী বলেও গণ্য করে। আর পরবর্তী ব্যক্তিকে মোটের ওপর পছন্দ (বা সহ্য) করে। তবে মাঝেমধ্যেই মেজাজ খারাপ হয়।

কারণ সে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করলেও সবকিছুতেই প্রশংসা করে না! হরহামেশা চোখে আঙুল দিয়ে দোষ-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়। কিছু বদঅভ্যাস পরিত্যাগ করতে চাপ দেয়। হয়তো সে কারণেই অনেক কিছু করার পরেও আমরা সেই মানুষদের ওপর প্রায়ই বিরক্ত হয়ে থাকি!

এখন প্রশ্ন হলো, এমন আচরণ কি যৌক্তিক? স্পষ্ট করে না বললেও ওপরের বর্ণনা থেকে এটা বোঝা কঠিন নয় যে প্রথম ব্যক্তি (বা গোষ্ঠী) হলো সোস্যাল মিডিয়ায় আমাদের সঙ্গে কানেক্টেড বন্ধুবান্ধব কিংবা ফ্যান-ফলোয়ার গ্রুপ। অধীনস্থ কর্মী বা সুবিধাভোগী অন্যান্য শ্রেণীও হতে পারে।

আর দ্বিতীয় ব্যক্তি হলো পরিবারের নিকটজন (মা-বাবা কিংবা জীবনসঙ্গী)। তাহলে পরবর্তী জন এত কিছু করার পরেও আমরা কেন তাদের ওপর অধিকতর সন্তুষ্ট হতে বা কৃতজ্ঞ থাকতে পারি না?

এ ব্যাপারে হার্জবার্গের থিওরি বিষয়টা বুঝতে আমাদের কিছুটা সাহায্য করবে। তার মতে, মানুষ যেগুলো পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত (বা পূর্বনির্ধারিত) থাকে সেগুলো পেলে মোটেই উদ্বুদ্ধ হয় না। যেমন একজন চাকরিজীবী মাস শেষে বেতন পেলে তা তাকে বিশেষ কোনো প্রণোদনা দেয় না; বরং সেটা পাওয়াকে খুব স্বাভাবিক এবং অধিকার মনে করেন।

অন্যদিকে যা পাওয়ার ব্যাপারে কোনো প্রত্যাশা থাকে না (যত ছোটই হোক না কেন), তা আমাদের বিশেষ প্রেষণা দেয়। যেমন অনন্য পারফরম্যান্সের জন্য টপ বসের কাছ থেকে অভিনন্দনপত্র! হয়তো সে কারণেই কেউ আমাদের ‘উপহার’ দিলে তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে ওঠে! কারণ সেটা প্রদানের ব্যাপারে তার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।

খেয়াল করবেন, পরিবারের সদস্যদের ওপর আমরা প্রায়ই বিরক্ত হই, নানা অভিযোগ করি। সহকর্মীদের অনেককেই সহ্য হয় না। প্রতিবেশীদের সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করি। এমন আচরণের পেছনে মূলত কাজ করে একগুচ্ছ প্রত্যাশা।

অর্থাৎ সেই (প্রিয়জন, সহকর্মী বা প্রতিবেশীর) ভূমিকায় তারা অনেক কাজ করবে বলে আমরা ধরে নিই। তন্মধ্যে তারা যেগুলো করে তা আলাদাভাবে চোখে পড়ে না। কারণ সেগুলো যে তারা করবে, সেটাই প্রত্যাশিত।

কিন্তু যে কাজগুলো তারা যথাযথভাবে করতে পারে না, সেগুলো অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়! আর সেই ৫ বা ১০ পার্সেন্ট ঘাটতির কারণে আমরা তাদের ওপর মহাবিরক্ত হয়ে থাকি। এরই মধ্যে তারা যে ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি কাজ ঠিকঠাক করেছে, তা আমাদের চোখেই পড়ে না!

বিপুল জনগোষ্ঠীর সোস্যাল মিডিয়ায় বিচরণ এ সংকটকে আরো প্রবল করে তুলছে। অচেনা, অজানা বা দূরবর্তী লোকের প্রশংসামূলক একটা শব্দ বা বাক্য আমাদের উদ্বেলিত করে। নিজের সম্পর্কে উচ্চধারণা পোষণ করি। আর পরিবার, কর্মক্ষেত্র বা চারপাশের মানুষগুলো কেন যে আমার সেই গুণগুলো লক্ষ করছে না, তা ভেবে জ্বলে-পুড়ে মরতে থাকি!

এক পর্যায়ে অনেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে কাছের মানুষগুলো তার অনন্য রূপ-গুণের কারণে হিংসা করে! এ ধারণা থেকে অনেকে তাদের অপছন্দ এমনকি ঘৃণা করতেও শুরু করেন! ক্ষেত্রবিশেষে স্থায়ী শত্রুতার সৃষ্টি হয়। কিন্তু কখনো তাদের মাথায় এ ভাবনাটা আসে না যে কাছের মানুষগুলোর মূল্যায়নই আমাদের প্রকৃত অবস্থান নির্দেশ করে।

কখনো ভেবেছেন, সেলিব্রিটি বা তারকারা কেন সাধারণ মানুষকে এড়িয়ে চলেন, সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো থেকে পারতপক্ষে নিজেদের দূরে রাখেন? কারণ এতে তাদের কৃত্রিমভাবে উপস্থাপিত ‘ইমেজ’ বজায় রাখা সহজ হয়। বেশি মানুষকে কাছে ভিড়তে দিলে একসময় তারা বুঝে ফেলবে যে তাদের স্বপ্নের তারকাও উচ্চৈঃস্বরে নাক ডেকে ঘুমায়, খকখক করে কাশে কিংবা নিজের অজান্তেই সোফায় পা তুলে বসে!

অর্থাৎ তখন তাদের বিশেষ নয়, বরং ‘অর্ডিনারি’ বলে গণ্য করবে। তাদের পরিকল্পিতভাবে সৃষ্ট বলয় অনেকটা ডায়মন্ড শপের মতো। সাধারণ মানুষ সেখানে প্রবেশের সাহস ও সুযোগ খুব একটা পায় না। আপনি যাদের অনন্য বা অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী মনে করেন তাদের অধিকাংশই এমন মোড়কে সুনিপুণভাবে আচ্ছাদিত। যতক্ষণ খুব কাছে না যাবেন, মোহ অক্ষুণ্ন থাকবে।

প্রবাদ রয়েছে, কাশবন দূর থেকেই সুন্দর! আজকাল সোস্যাল মিডিয়া ঠিক এ জায়গাতেই রাজত্ব করছে। আরেকটু সহজ করে বলি, আপনি হয়তো কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজের শ-খানেক ছবি ওঠালেন। তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরটা (প্রয়োজনীয় সম্পাদনাসহ) ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে আপলোড করছেন। ফলে মানুষ সেটা পছন্দ করবে, সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?

কিন্তু আপনার ‘আসল চেহারা’ সেটা নয়। তার বড় প্রমাণ হলো, অবশিষ্ট ছবির অধিকাংশ আপনি নিজেই পছন্দ করেননি! কিছু ছবি দেখে আপনার নিজেরই বিরক্ত লেগেছে। অন্যরা দেখার আগে সেগুলো ডিলিট করে ফেলেছেন। তাছাড়া দুঃখভারাক্রান্ত মানুষটাও ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে হাসিমুখে পোজ দেয়!

ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা লাইক দেয় ও কমেন্ট করে, তাদের সঙ্গে আপনার কাছের মানুষদের মূল্যায়নে দৃশ্যমান পার্থক্য হবে, সেটা খুব স্বাভাবিক। কারণ কাছের লোকেরা তো প্রতিনিয়ত আপনার আসল চেহারা দেখে। ক্ষণিকের হাসিমুখ বা বাহ্যিক সদাচরণের চেয়ে হয়তো আপনার কদর্য দিকগুলোর তীব্রতা অনেক বেশি। সেগুলো তাদের ব্যথিত করে, মাঝেমধ্যে জীবন দুঃসহ করে তোলে।

আমরা নিবন্ধের শুরুতে বর্ণিত দুজনের কাছে ফিরে গেলে হিসাবটা সহজেই মিলে যাবে। কেন নীরবে-নিভৃতে বছরের পর বছর আমাদের জন্য কাজ করে যাওয়া মানুষগুলোর চেয়ে মাঝেমধ্যে দেখা হওয়া মানুষগুলোকে বেশি ভালো মনে হয়, তার জবাব মিলবে। আজকাল পরকীয়া বা অনৈতিক নানা সম্পর্ক সৃষ্টির পেছনেও খুব সম্ভবত এ ফ্যাক্টর প্রবলভাবে কাজ করছে।

আব্রাহাম মাসলো মানুষের জীবনে দরকারি জিনিসের ক্রমগুলো পাঁচটি স্তরে ব্যাখ্যা করেছেন। নগরজীবনে সচ্ছল, ভালোভাবে খেয়ে পরা মানুষগুলো কেন যেন মাসলোর পিরামিডের তৃতীয় ধাপে এসে আটকে গেছে! সামাজিক স্বীকৃতির ‘কাঙাল’দের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। লাইক ও কমেন্ট তাদের অনেকের কাছেই রুটি-রুজির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে! নির্ধারিত কাজ ফেলে তারা একটা ফাটাফাটি ছবি তুলতে বা হিট হওয়ার মতো পোস্ট লিখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।

কিন্তু চাকরি না থাকলে তো বোনাস মিলবে না। তাই বেতন লাভের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণটা বুঝতে চাইলে কোনো কারণে বেতন বন্ধ থাকা একজন সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলে দেখুন। তাছাড়া অসুস্থ হয়ে এক মাস বিছানায় পড়ে থাকলে বোঝা যায় জীবনের জন্য কারা সত্যিই দরকারি। যারা কোনো দায় নেয় না, বিপদের সময় হাত বাড়ায় না, তাদের ক্ষণিকের প্রশংসা জীবনের কঠিন সময়গুলোয় মোটেই সাহায্য করে না।

তাছাড়া দূরবর্তী মানুষদের ক্ষণিকের দেখা ‘আসল’ আপনি নন। আপনার শত বৈশিষ্ট্যের দু-একটি দেখে তারা প্রতিক্রিয়া জানায়। অনেকে আপনার মেধা ও যোগ্যতার কৃত্রিম প্রশংসা করে ফায়দা লুটতে চায়। সর্বোপরি কথা হলো, তথাকথিত ‘সামাজিক স্বীকৃতি’র আবেদন ক্ষণস্থায়ী। ফেক সেই জগতের বাইরে জীবনের কঠিন সময়গুলোয় ‘মনের শান্তি’ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আমাদের এত অহংকার, অহমিকা সব মুহূর্তে ধুলায় মিশে যেতে পারে। আমরা অন্যদের ব্যাপারে অহরহ নাক গলাই অথচ নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা যেকোনো সময় রহিত হয়ে যেতে পারে। করোনা আক্রান্ত কত রোগীর অক্সিজেনের জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে ছোটাছুটি করছিল। তখন তাকে কোথায় নেয়া হবে, কী চিকিৎসা দেয়া হবে, সে ব্যাপারে কেউ তার মতামত শুনতে চায়নি। অর্থাৎ জীবিত থেকেও পুরোপুরি ‘ক্ষমতাহীন’ একজন মানুষে পরিণত হতে কতক্ষণ?

আর খুব সংগতকারণেই মৃত্যুর পর আপনার মরদেহ কোথায় দাফন হবে, সে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার পুরোপুরি অন্যদের হাতে থাকবে। এমনকি এ ব্যাপারে আপনার অসিয়ত থাকলেও তা যে মানা (সম্ভব) হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই যারা নিজেদের অতি ক্ষমতাধর ভেবে ধরাকে সরা জ্ঞান করেন, খুব সম্ভবত তারা অতি ভাগ্যবান। কারণ জীবনের অতি নিষ্ঠুর রূপ এখনো সেভাবে তাদের সামনে হাজির হয়নি।

মনে রাখা দরকার, গাছের টিকে থাকার জন্য পাতার চেয়ে শিকড় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশংসাকারী দূরবর্তী মানুষগুলো আপনার জীবনে পাতার মতো। জীবনের নানা স্তরে এমন অসংখ্য পাতা গজিয়েছে; আবার ঝরেও গেছে। যতদিন বেঁচে থাকবেন, এ প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। কিন্তু পরিবার ও প্রিয়জন শিকড় ও কাণ্ডের ভূমিকা পালন করে। তাদের ত্যাগ, চেষ্টা ও সহযোগিতায় আমরা দাঁড়িয়ে থাকি, ফুলে-ফলে সুশোভিত হই।

সদ্য গজানো পাতা যতই সুদৃশ্য হোক না কেন দ্রুতই তা রঙ বদলাবে। প্রকৃতির নিয়মে একসময় ঝরেও যাবে। কিন্তু শিকড় ও কাণ্ড আপনাকে সব ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে সুরক্ষা দিতে সচেষ্ট থাকবে। সাধ্যে না কুলালেও শেষ পর্যন্ত চেষ্টাটা করে যাবে। তাই ‘হীরা ফেলে কাচ তুলে’ নেয়ার ব্যাপারে সাধু সাবধান!

মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘মস্তিষ্কের মালিকানা’ বইয়ের লেখক।

উৎস: বণিকবার্তা, ১২ অক্টোবর ২০২১।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *