দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: জনসাধারণের ভোগান্তি! – মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার

মুক্তমত

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খুবই কষ্টে সময় পার করছেন। করোনার প্রাদুর্ভাব এই সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট গোটা দুনিয়ায় বিরাজমান। একই সংকট আমাদের দেশে কোনো অংশে কম নয়; বরং অত্যধিক। কোভিড-১৯ এর প্রভাব থেকে নিরাপদ ও স্বস্তির জন্য লকডাউন ও কঠোর বিধিনিষেধ জারি করতে হয়েছে। এতে দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের কষ্টের যেন শেষ নেই। এমনকি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে পর্যন্ত কঠিন সময় অতিবাহিত করতে হচ্ছে। এরই মাঝে সম্প্রতি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি জনসাধারণের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে!

৩ অক্টোবর, রবিবার। যোহরের নামাজের পর সিলেট নগরীর সুপরিচিত মদীনা মার্কেটে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয়ের ফাঁকে দু’জন ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ আলোচনার সুযোগ হয়। তরুণ ব্যবসায়ী সজিবুর রহমান ও রুহুল আমীনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে জানা যায় যে, দ্রব্যমূল্য কেমন বৃদ্ধি পেয়েছে। কাঁচা মরিচের ঝাঁজ সবচেয়ে বেশী। দাম অত্যধিক। ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হওয়া প্রতিকেজি কাঁচা মরিচের বর্তমান মূল্য ২৪০ টাকা। গাঁজরের মূল্য ৪০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান মূল্য ১০০ টাকা। মুলা ১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা, পেঁপে ৮ টাকা বেড়ে ২০ টাকা, ঢেঢ়শ ১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা, টমেটো ২০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০-৬০ টাকা বেড়ে ১০০-১২০ টাকা ও শশা ১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা কেজি। গোশতের দামও বেড়েছে। ফার্মের মোরগ প্রতিকেজিতে ২৫-৩০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকা, সোনালী মোরগ প্রতি পিসে ৭০ টাকা বেড়ে ২২০ টাকা, মোরগ (কক) প্রতিকেজিতে ৯০-১০০ টাকা বেড়ে ২৮০ টাকা, গরুর গোশত প্রতিকেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে ৫৮০ টাকা ও কোয়েল প্রতি পিসে ৮ টাকা বেড়ে ৩৩ টাকা। এছাড়াও চাল, ডাল ও তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি পাওয়া, মোটেও কাম্য নয়।

দৈনিক জালালাবাদে প্রকাশিত বাজারে শীতের সবজি, দাম চড়া শীর্ষক এক প্রতিবেদনে সিলেটের বাজারের চিত্র উঠে এসেছে (৩ অক্টোবর): মৌসুম না এলেও সিলেটের বাজারে উঠতে শুরু করেছে বেশ কিছু শীতকালিন সবজি। এরমধ্যে রয়েছে, টমেটো, শিম, ফুলকপি, বাধাঁকপি, গাজরসহ কিছু সবজি। কিন্তু দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। শুক্রবার নগরীর বন্দরবাজার, আম্বরখানা ও সুবিদবাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিভিন্ন সবজি বাজার ঘুওে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, বাজারে আমদানি হয়েছে নানান শীতকালীন সবজি। ক্রেতাদের শিম কিনতে কেজি প্রতি গুনতে হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকা পর্যন্ত। প্রতি পিস ফুলকপি (ছোট) কিনতে লাগছে ৪০-৪৫ টাকা, বাধাঁকপি (ছোট) বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৪০ টাকা পিস, গাজর প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকা ও টমেটো ১২০-১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা দরে, লাউ প্রতি পিস ৫০-৬০ টাকা, শশা প্রতি কেজি ৫০-৬০ টাকা, কালো বেগুন ৮০ থেকে ৯০ টাকা, ঝিঙ্গা ৫৫-৬০ টাকা, কাকরোল ৫০-৬০ টাকা, চিচিঙ্গা ৫০-৫৫ টাকা, পটল ৪০-৫০ টাকা, ঢেড়শ ৫০ টাকা, বরবটি ৬০-৭০ টাকা, পেঁপে ৩০-৩৫ টাকা, কচুর মুখি ৫০-৬০ টাকা, লাল গোল আলু ৩০ টাকা, সাদা গোল আলু ২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মিষ্টি কুমড়া সাইজ ভেদে ৫০-৮০ টাকা ও মূলা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা দরে। বন্দরবাজারের সবজি বিক্রেতা ওসমান আলী জানান, শীতের সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে ঠিকই তবে আমাদেরকে দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। তাই দাম দিয়েই বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারী বাজার থেকে সবজি বেশী দামে ক্রয় করতে হচ্ছে। তবে কয়েকদিন গেলে সবজির আমদানী বাড়বে, তখন দামও কমবে। আম্বরখানা সবজি বাজারে কথা হয় ক্রেতা জসিম উদ্দিনের সাথে। তিনি জানান, দীর্ঘ লকডাউনের পর সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। নিজের আয় রোজগারও এখন কমে গেছে। সন্তানদের জন্য সবজি কিনতেও এখন বেশ বেগ পোহাতে হয়। বাজারে সবজির অতিরিক্ত দাম। ৫০ টাকার নিচে কোন সবজিই মিলছেনা।

একাধিক জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রাজধানীসহ সারাদেশের নিত্যপণ্যের বাজারে লাগামহীন দাম বৃদ্ধির চিত্র ফুটে উঠেছে। তাছাড়া বিভিন্ন জেলা ও বিভাগের অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায়ও সেই চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। যা উদ্বেগজনক। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও সমস্যা ও এর সমাধানকল্পে কী পদক্ষেপ নেয়া যায়, এ ব্যাপারে লেখালেখি কম হচ্ছে না। লেখালেখিতে অনেক পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে। যেমন: কেউ লিখেছেন, সরকারকে অসাধু ও অধিক মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। কেউ লিখেছেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত রাখা জরুরী। কারো কারো অভিমত হলো, বাজার মনিটরিং বৃদ্ধি করতে হবে। বাজারে পণ্যের মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে রাখতে হবে।

সর্বপর্যায়ের সম্মানিত ও প্রিয় ব্যবসায়ীদের প্রতি অনুরোধ- আপনাদের ব্যবসায় লোকসান হোক, আমরা কখনোই কামনা করি না। আবার অতিমুনাফা কিংবা লাভের আশায় আপনাদের কারো কারো অতিরঞ্জিত বাড়াবাড়ির কারণে জনসাধারণের ভোগান্তি বাড়ুক, তাও মেনে নেয়া যায় না। মুসলিম ব্যবসায়ীদের, আল্লাহ তা’য়ালা ও রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর নির্দেশনা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আশাকরি পথচলায় তা অনুপ্রাণিত করবে, ইনশা আল্লাহ।

আর আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন। [২. সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৭৫]। আর তোমরা ওজনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত করো এবং ওজনে কম দিও না। [৫৫. সূরা আর-রাহমান: ৯]। দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি বিশ্বাস করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে। মহাদিনে? [৮৩. সূরা আল-মুতাফফিফীন: ১-৫]। মাপার সময় পুরো মাপবে এবং সঠিক পাল্লা দিয়ে ওজন করবে। [১৭. সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৫]। ইনসাফ সহকারে পুরো ওজন ও পরিমাপ করো। আমি কাউকে তার সামর্থ্যের চাইতে বেশীর জন্য দায়িত্বশীল করি না। [৬. সূরা আল-আনয়াম: ১৫২] মুফাসসির আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা:) বলেন: ওজন ও মাপ এমন একটি কাজ যে, এতে অন্যায় আচরণ করে তোমাদের পূর্বে অনেক উম্মত আল্লাহর আযাবে পতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। [কুরতুবী; ইবনে কাসীর]। পরবর্তী অংশের ব্যাখ্যায় কুরতুবী, ইবনে কাসীর; সাদী’র বর্ণনায় পাওয়া যায়: সাধ্যানুযায়ী পুরোপুরি ওজন করো। তারপরও যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে ওজনে কমবেশী হয়ে যায়, তবে তা মাফ। কেননা এটা তার শক্তি ও সাধ্যের বাইরে।

রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো খাদ্যদ্রব্য চল্লিশ দিনের বেশী গুদামজাত করে রাখবে, সে উক্ত খাদ্য সদকা করে দিলেও তার গুদামজাত করার গুনাহ মাফ হবে না। [মিশকাত]। যার খাদ্য, পানীয়, পোশাক হারাম এবং শরীর হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট, আল্লাহ কিভাবে তার ডাকে সাড়া দিবেন? [মুসলিম]। হযরত আবু বকর (রা:) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা:)-কে বলতে শুনেছি, যে শরীর হারাম খাদ্য দিয়ে পরিপুষ্ট হয়, জাহান্নামই তার জন্য শ্রেষ্ঠ স্থান। [বুখারী]। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন: হারাম খাদ্য মুখে নেয়ার চেয়ে মাটি খাওয়া ভালো। [মুসনাদে আহমদ]। হযরত আনাস (রা:) বলেন, আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমার দোয়া কবুল হয়। রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেন: হে আনাস! তোমার উপার্জনকে পবিত্র ও হালাল রাখো। তবে তোমার দোয়া কবুল হবে। কেননা হারাম খাদ্যের এক লোকমাও মুখে নিলে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার দোয়া কবুল হয় না। [তারগীব ওয়াত তারহীব]।

[লেখক: সহকারী মহাসচিব, বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন।]

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *