তেলের দাম বৃদ্ধি ও ধর্মঘট: ভাড়া বাড়ানোর ইঙ্গিত!-মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার

মুক্তমত

তেলের দাম বৃদ্ধি ও ধর্মঘট: ভাড়া বাড়ানোর ইঙ্গিত!

মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই আরেকটি জঞ্জাল সামনে হাজির। বুধবার (৩ নভেম্বর ২০২১ ইং) সরকার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা এবং বৃহস্পতিবার এলপি গ্যাসের দাম প্রতি কেজির সিলিন্ডারে ৫৪ টাকা করে বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে গণপরিবহন ৭২ ঘন্টার জন্য বন্ধের ঘোষণা আসে। দাবী না মানলে আবারও একই ঘোষণা আসবে বলে জানা যায়। পরিবহন ধর্মঘটের উদ্দেশ্য তেলের দাম কমানো, নতুবা ভাড়া বৃদ্ধি করতেই হবে।

পরিবহন ভাড়া (সহনীয় পর্যায়ে) বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এতে জনসাধারণের ভোগান্তি বাড়বে। দুর্ভোগ পোহাতে হবে। এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে নিজের ব্যক্তিগত ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান লিখেছেন: একদিকে অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে জ্বালানী তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি- যা একেবারেই অযৌক্তিক। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে পরিবহন সেক্টরে ধর্মঘট। পরিবহন সেক্টর ভাড়া দ্বিগুণ করার অমানবিক ও অন্যায্য দাবি উত্থাপন করেছে। এ নিয়ে সরকারের সাথে নেগোসিয়েশান চলছে। সর্বাবস্থায় জনগণই জিম্মী। জনগণ এই পরিস্থিতিকে আপোষে পিঠা ভাগাভাগি হিসেবেই দেখছে। অন্যায় ও অযৌক্তিক এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জনগণকেই সোচ্চার হতে হবে।

বিবিসির সূত্রে জানা যায় যে, শনিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবহন খাত নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী, অযৌক্তিক ও হঠকারী’ সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ২৩% বাড়ায় মানুষের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন, খাদ্য পণ্য ও কৃষিজ উৎপাদনসহ সামগ্রিক ব্যয় আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে লঞ্চ-স্টিমারের মালিকরা শতভাগ ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। যদি জ্বালানি তেলের দাম কমানো একেবারে সম্ভব না হয়, তাহলে যেন পরিবহন মালিকরা ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য মাত্রায় ভাড়া বৃদ্ধি করেন, সেদিকে নজর রাখা উচিত। চৌধুরী মনে করেন, যদি জ্বালানি তেলের দাম কমানো সম্ভব না হয়, তাহলে কিলোমিটার প্রতি বাস ভাড়া যেন সর্বোচ্চ ১৫ পয়সার বেশি না বাড়ানো হয়, তা নিশ্চিত করা উচিত।

ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক-শ্রমিক সংগঠনের আহ্বায়ক রুস্তম আলী খান বলেন, আমরা চাই তেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হোক। আর যদি দেশের স্বার্থে দাম বাড়াতেই হয়, তাহলে যেন সহনীয় মাত্রার মধ্যে থেকে দাম কতটুকু বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। একবারে লিটারে ১৫ টাকা দাম বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক নয়, এরকম নজির আমরা কখনো দেখিনি।

কোনো আলোচনা ছাড়াই তেলের দাম একতরফা বাড়ানোর কারণে পরিবহন খরচ অনেক বাড়বে দাবি করে বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ ঘোষণা করে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি। সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি কেন্দ্রীয়ভাবে ধর্মঘটের কোনো ঘোষণা না দিলেও জেলা পর্যায় থেকে মালিক-শ্রমিকরা বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় ঢাকাগামী যান চলাচল শুক্রবার থেকে প্রায় বন্ধ ছিলো।

নয়াদিগন্তের (অনলাইন, ৭ নভেম্বর ২০২১ ইং) এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, পরিবহনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে এবং এর সাথে পরিবহন ভাড়া সমন্বয় করার দাবিতে গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। অনেক রুটে ঘোষণা ছাড়াই বর্ধিত হারে ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এরই একপর্যায়ে প্রথমে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিকরা ধর্মঘটের ডাক দেয়। পরে একই দাবিতে ধর্মঘটের ঘোষণা দেয় বাস ও লঞ্চ মালিকরাও। টানা তিন দিন ধরে চলেছে পরিবহন সেক্টরে এই অস্থিরতা। এ দিকে কোনো প্রকার গণশুনানি না করে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কড়া সমালাচনা করেছেন কন্যজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর শামসুল আলম। তিনি বলেছেন, সরকার যেটা করেছে এটা ঠিক হয়নি; বরং সরকারের এই সিদ্ধান্ত একটি অন্যায় সিদ্ধান্ত। সরকার এটা করতে পারে না। তিনি বলেন, মূল্য স্থিতিশীল তহবিল গঠন করে সরকার এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। এ ছাড়া সরকারের এমন সিদ্ধান্তে শুধু পরিবহন খাতেই অস্থিরতা তৈরি হবে না, বরং দীর্ঘ মেয়াদে পুরো অর্থনীতিতেই এর প্রভাব ও অস্থিরতা বাড়াবে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়িয়ে দেবে। অন্য দিকে দুই দিন ধরে দেশজুড়ে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটে ভোগান্তিতে পড়েছেন অসংখ্য যাত্রী। ঢাকার বাইরে থেকে কোনো যাত্রী আসতে পারছেন না। এমনকি ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় আসতে পারছে না কোনো পণ্যও। ফলে ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রাজধানীর কাঁচাবাজারেও। এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে জর্জরিত নিম্ন মধ্যবিত্তের মানুষ। তার ওপর ধর্মঘটের কারণে এর ধকল কাটিয়ে উঠতেও আরো একটি বড় ধাক্কা সামাল দিতে হবে তাদের।

বর্তমান সময়ে গরীব মানুষেরা খুবই কষ্টে সময় পার করছেন। মধ্যবিত্তদের অবস্থাও তেমন একটা ভালো নেই। করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। দারিদ্রতার হার বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘২০২০ সালের জুনে নতুন দারিদ্র্যের হার অনুমান করা হয়েছিল ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ। ২০২১ সালের মার্চে এটি কমে ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়। গত এপ্রিলে শুরু হওয়া করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় এ হার আগস্টে বেড়ে হয়েছে ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ। তিনি বলেন, ‘করোনা সঙ্কটের কারণে প্রাথমিক অবস্থায় আয় কমে গেলেও, সে ধকল সামলে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এ ইতিবাচক ধারা দেখে অনেকে নতুন দারিদ্র্যের বিষয়টিকে ক্ষণস্থায়ী সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তবে সঙ্কটের ১৮ মাস যাওয়ার পর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানার পর আবারও সে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বিপরীত দিকে ঘুরে যায় এবং নতুন দারিদ্র্যের সমস্যা আরো বেড়ে যায়। ২০২১ সালের এপ্রিলে দ্বিতীয়বারের মতো লকডাউন দেয়ার ফলে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সমীক্ষায় জানা গেছে, আয় পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বিপরীত দিকে হাঁটছে এবং মহামারী আঘাত হানার ১৮ মাস পর সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী দরিদ্রদের মধ্যে ২৩ শতাংশের গড় আয় করোনা পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে কমে গেছে। একদিন পর পর এক বেলা খাওয়া বাদ দিয়েছে এরকম পরিবারের সংখ্যা ২০২১ সালের মার্চে ২ শতাংশ ছিল, যা আগস্টে বেড়ে ৭ শতাংশ হয়েছে। সমীক্ষায় বলা হয়, ২০২০ সালের এপ্রিলে দেয়া প্রথম লকডাউনের ধাক্কা ধীরগতিতে হলেও সামলে উঠছিল শহরের বস্তি এবং গ্রামবাসী। সমীক্ষায় দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চের তুলনায় শহরের বস্তি এবং গ্রামবাসীর আয় ১৮ এবং ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, যা পুনরুদ্ধারের ধারার বিপরীত। অধিকাংশের মতে সর্বশেষ লকডাউনের সিদ্ধান্ত ভালো হলেও জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেকই জানিয়েছেন তাদের জীবিকার সঙ্কটের কথা। স্বল্পশিক্ষিত ও দরিদ্রদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জানিয়েছেন, তারা প্রত্যাশিত কাজ পাননি। প্রথম লকডাউনে ৪৫ শতাংশ পরিবার সামান্য ত্রাণ পেলেও দ্বিতীয় লকডাউনে সেটি নেমে এসেছে ২৩ শতাংশে। ফলে জীবিকার যে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া চলমান ছিল, তা কিছুটা ঘুরে গেছে এবং আগস্টে মানুষের আয় করোনার আগের তুলনায় ২৩% কমেছে। (নয়াদিগন্ত)।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের প্রতি অনুরোধ- ভাড়া বৃদ্ধি নয়, তেলের দাম কমানো হোক। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। জনসাধারণকে কষ্ট থেকে উদ্ধার করুন। অনেক কষ্টে কাটছে মানুষের দিনকাল। উপলব্ধি করুন। সহযোগিতায় এগিয়ে আসুন।

[লেখক: সহকারী মহাসচিব, বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন।]

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *