টাকার বিনিময়ে নেতৃত্ব: ছাত্র রাজনীতিতে অশুভ কর্তৃত্ব! -মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার

মুক্তমত

টাকার বিনিময়ে নেতৃত্ব: ছাত্র রাজনীতিতে অশুভ কর্তৃত্ব!

মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার

নতুন প্রজন্মের বিশাল একটি অংশ ছাত্র রাজনীতিকে পছন্দ করে না। কথায় কথায় ছাত্রজীবনে রাজনীতির দরকার নেই বলে মন্তব্য করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা যুক্তি ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করে। ছাত্র রাজনীতির নামে চলমান অপরাজনীতির বিরোধিতা করে। এমনকি জ্ঞানীগুণী মানুষ অনেকেই এই মতকে সাধুবাদ জানান। কোনো কোনো বুদ্ধিজীবীকেও এর স্বপক্ষে ক্ষুরধার যুক্তি নির্ভর অভিমত প্রকাশ করতে দেখা যায়। অন্যদিকে, ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে যারা থিউরিটিক্যাল ও প্র‍্যাকটিক্যাল নলেজ রাখেন; তারা যুক্তি ও বাস্তবতার নিরিখে এর পক্ষে বলিষ্ঠ আলোচনা উপস্থাপন করে থাকেন। স্মরণ করিয়ে দেন বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির সোনালী ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০১৮ সালের কোটা বিরোধী ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রসমাজের সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ ও তাদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ছাত্র রাজনীতির ইতিবাচক দিকগুলো দেশের প্রত্যেক নাগরিককেই উদ্বুদ্ধ করে। আবার নেতিবাচক বিষয়গুলো হতাশ করে। কষ্ট দেয়। এমনকি কখনো কখনো বিরোধিতায় বাধ্য করে।

১২ অক্টোবর ২০২১ ইং। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সিলেট জেলা ও মহানগরীর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়। ঘোষণার পর পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে। এমনকি বিকেলে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়েছে।

টাকার বিনিময়ে এই কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটির সভাপতি শাহারিয়ার আলম সামাদ। বিকেল ৪টায় তেলিহাওর থেকে তার নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিল শেষে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, জেলা ও মহানগর কমিটির শীর্ষ ৪টি পদ ৩০ লাখ করে মোট ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। যাদের পদ দেয়া হয়েছে তারা কোনো ছোট গাড়ি স্ট্যান্ডের কমিটি পরিচালনারও যোগ্যতা রাখেন না। এছাড়াও তারা অছাত্র। (সিলেটভিউ২৪ডটকম)।

কমিটি ঘোষণা নিয়ে ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে সিলেট ছাত্রলীগে শিরোনামে দৈনিক নয়াদিগন্তের প্রতিবেদন (অনলাইন): ঘোষণার মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যেই জেলা ছাত্রলীগের কমিটি প্রত্যাখান করে বিক্ষোভ মিছিল করেছে দলের একাংশের নেতাকর্মীরা। মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় নগরীর তেলিহাওর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। মিছিলটি নগরীর জিন্দাবাজার আল-হামরা মার্কেটের সামনে এলে পুলিশ মিছিলকারীদের বাধা দেয়। পুলিশী বাধা উপেক্ষা করে মিছিল নিয়ে চৌহাট্টা পয়েন্টে যান তারা। সেখানে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। কিছু সময় সড়ক অবরোধ শেষে ফিরে যান তারা।
এ সময় মিছিলকারীরা টাকার বিনিময়ে কেন্দ্রের সংসদ কমিটির শীর্ষপদ বিক্রির অভিযোগ করেন। এছাড়া জেলা ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক রাহেল সিরাজের নাম ধরে নানা কটূক্তিমূলক স্লোগান দিতে দেখা যায় তাদের। জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করে আগামী এক বছরের জন্য কমিটি অনুমোদন দেন। এতে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে টিলাগড় রঞ্জিত গ্রুপের নাজমুল আলম ও তেলিহাওর গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাহেল সিরাজের নাম ঘোষণা করা হয়। মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দর্শনদেউড়ি গ্রুপের কিশওয়ান জাহান সৌরভ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাশ্মির গ্রুপের নাঈম আহমদের নাম ঘোষণা হয়। এছাড়া কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে আরো ছয়জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তারা হলেন- জাওয়াদ ইবনে জাহিদ খান, বিপ্লব কান্তি দাস, মুহিবুর রহমান মুহিব, কনক পাল অরূপ, হোসাইন মোহাম্মদ সাগর ও সঞ্জয় পাশী জয়। এদিকে কমিটি ঘোষণার পর ছাত্রলীগের একাংশের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দেয়। তেলিহাওর গ্রুপের রাহেল সিরাজ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পেলেও গ্রুপের অভ্যন্তরে অসন্তোষ চরমে পৌঁছায়। তেলিহাওর গ্রুপের বড় অংশের নেতাকর্মীরা রাহেল সিরাজের পরিবর্তে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে চেয়েছিলেন জাওয়াদ ইবনে জাহিদ খানকে। কিন্তু জাওয়াদকে সাধারণ সম্পাদক না করে কেন্দ্রীয় সদস্য করায় গ্রুপের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।

কেন্দ্রীয় সদস্য থেকে দুই জনের অব্যাহতি শিরোনামে দৈনিক জালালাবাদে (অনলাইন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে: সিলেট জেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পরপরই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। মাত্র দুই সদস্যর কমিটি আর ৪ জনকে কেন্দ্রীয় সদস্য করা হয়। কমিটি ঘোষণা করার পরপরই অভিমান করে দুইজন পদত্যাগ করেছেন। তারা হলেন, সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মুহিবুর রহমান মুহিব ও সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাওয়াদ ইবনে জাহিদ খান। তারা দুজনকেই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য করা হয়েছিল। অভিমানী মুহিব নিজেকে কেন্দ্রীয় কমিটির যোগ্য মনে করছেন না। তাই ‘স্বেচ্ছায় অব্যাহতি’ নিয়েছেন উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেন ‘আমাকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্য করায় আমি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সম্মানিত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, আমি এই বিশাল পদের যোগ্য নই। তাই, আমি স্বেচ্ছায় এই পদ থেকে অব্যাহতি নিলাম।’ এরপরই পদ প্রত্যাখান করেন জাওয়াদ ইবনে জাহিদ খান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘প্রিয় সতীর্থ, সহযোদ্ধা শুভাকাঙ্খী সদ্য ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানতে পারলাম আমাকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য মনোনীত করা হয়েছে। আমি উক্ত সদস্য পদ প্রত্যাখ্যান করলাম। রাজনীতি থেকে যখন অপরাজনীতি শক্তিশালী হয়ে যায়, তখন আমার মতো কর্মীর কাছে প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া বিকল্প কোন উপায় থাকে না।’

আসলে এরকম সংবাদ ব্যথিত করে। মনটা খারাপ হয়ে যায়। আমার লেখাটি ছাত্রলীগকে হেয় করার জন্য নয়। ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত প্রত্যেকটি দল ও সংগঠন মেধা, যোগ্যতা ও নৈতিকতায় বিকশিত হোক; এটি একান্ত প্রত্যাশা।

নেতৃত্বের পরিচয়: নেতৃত্ব শব্দের অর্থ ব্যাপক। ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Leadership যা Lead শব্দ থেকে এসেছে। অর্থ: পথ দেখানো (To guide), চালিত করা (To conduct); আদেশ করা (To direct) ইত্যাদি। A leader is he, who knows the way, goes the way and shows the way. নেতৃত্ব হলো- Lead to show the way by going first. প্রথমে অগ্রসর হয়ে পথ দেখানো। রবার্ট গোলেমবিউস্কি বলেন, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে জনগণকে প্রভাবান্বিত করার যোগ্যতাই হচ্ছে নেতৃত্ব। রবার্ট ডাবিনের মতে, নেতৃত্ব হচ্ছে সিদ্ধান্ত প্রণয়নের কর্তৃত্ব অর্জনের অধিকার ও অনুশীলন।

জাতীয় বিতর্ক মঞ্চ কর্তৃক প্রকাশিত সফল বিতার্কিক, বক্তা ও নেতা হওয়ার কৌশল গ্রন্থে নেতা হওয়ার জন্য করণীয় শীর্ষক পয়েন্টে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গুণাগুণ তুলে ধরা হয়েছে। তা থেকে কয়েকটি গুণ (আংশিক) তুলে ধরলাম। ১. Vision: আপনার প্রচুর কল্পনাশক্তি থাকতে হবে। ২. Be honest: আপনি সৎ হোন। আপনি যদি সবসময় সৎ থাকেন, মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করবে। ৩. Be a decision maker: সিদ্ধান্ত নিন। আপনি যদি সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি করেন, আপনি আর যা-ই হোন না কেন, নেতা হবেন না। ৪. Be a life long learner: সারাজীবন শিখবেন। কখনোই বলবেন না, আমি সবার চেয়ে বড়, আমার পড়াশোনার দরকার নেই। ৫. Be knowledgeable: জ্ঞানী হোন। একজন নেতাকে up to date হতে হবে। ৬. Be organized: এটি একজন নেতার একটি বড় গুণ। জীবনে গুছিয়ে কাজ করতে হবে। ৭. Never give up: কখনো হাল ছেড়ে দেবেন না। আপনাকে অধ্যবসায়ী হতে হবে। ৮. Be a role model: আপনি সবার জন্য আদর্শ হোন।

গোটা দুনিয়াবাসীর জন্য নেতৃত্বের ব্যাপারে সর্বোত্তম আদর্শ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)। সাহাবায়ে কেরামগণ তাঁর কাছ থেকে শেখা সেই দীক্ষা আজীবন কাজে লাগিয়েছেন। কিয়ামত পর্যন্ত এরকম অতুলনীয় নেতৃত্বের সবক আর কোথাও পাওয়া যাবে না। কুরআন, হাদীস-সুন্নাহ’র আলোকে গুণগুলো কিরূপ হওয়া উচিৎ, তা উল্লেখ করার চেষ্টা করছি। ভুলত্রুটি হলে, আল্লাহ তা’য়ালা ক্ষমা করুন। নেতৃত্বের গুণাবলী: দ্বীনি ইলম, আল্লাহ ভীতি, আনুগত্য, দেশপ্রেম, আমানতকারী, দূরদর্শিতা, উদ্ভাবনী ও বিশ্লেষণ শক্তি, উদারতা, অমায়িক ব্যবহার, মেজাজের ভারসাম্য, অনড় মনোবল, কর্মে দৃঢ়তা, পদের প্রতি লোভহীনতা, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও শৃঙ্খলা বিধানের যোগ্যতা।

ছাত্র রাজনীতি যে কারণগুলোর জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, তা দূর করা প্রতিটি দল ও সংগঠনের জন্য অবশ্য কর্তব্য। নেতৃত্বের অভিলাষ, স্বার্থ হাসিলের নেশা, মেধা ও নৈতিকতা বিবর্জিত অপচেষ্টা বন্ধ হোক। ছাত্র রাজনীতি হোক- সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির মাধ্যম। নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার বাতিঘর। মানবতার কল্যাণ ও জাতির সার্বিক মুক্তির অনন্য ঠিকানা।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *