ছাত্রদের চুল কাটায় মামলা: শিক্ষক গ্রেফতার!- মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার ।

মুক্তমত

শুরুতেই দু’টো গল্প শেয়ার করছি। যা অবাস্তব কিংবা বানানো নয়। বরং নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া শিক্ষণীয় ঘটনা। এক. তখন আমি খুব ছোট। মাদ্রাসায় ভর্তি হই নি। বাসায় পড়াশুনা করি। আব্বা আম্মা সহযোগিতা করতেন। অন্যদিকে, একাধিক শিক্ষক বাসায় এসে আমাদের পড়াতেন। একজন হুজুরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত শিখেছি। তিনি নিয়মিত বাসায় এসে শিখিয়েছেন। একদিনের ঘটনা: তিনি পড়াতে এসেছেন। এসেই জানতে চাইলেন, গতকাল যা পড়িয়েছি এবং শেখার জন্য বলেছিলাম; তা কী বলতে পারবে? আমার জবাব, জ্বী না। কারণ তা আর পড়া হয় নি। তিনি কিছুটা রাগান্বিত হয়ে বেত্রাঘাত করলেন। ব্যথা একটু বেশী পেয়েছিলাম। তাই উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করছিলাম। পাশের কক্ষ থেকে আব্বা আসলেন এবং হুজুরকে তাঁর কক্ষে ডেকে নিলেন। আলাপচারিতা শেষে হুজুর চলে গেলেন। পরেরদিন নির্ধারিত সময়ে প্রস্তুতি নিয়ে পড়ার কক্ষে বসে ছিলাম। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। হুজুর আসলেন না। পরবর্তীতে আম্মার কাছ থেকে জানলাম, হুজুর আর আসবেন না। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? আম্মা জানালেন, তোমার আব্বা হুজুরকে গতকাল বিদায় জানিয়েছেন। শাস্তি প্রয়োগ ও তোমার কান্না, তোমার আব্বা মেনে নিতে পারেন নি। এই কথা শুনার পর কাঁদতে শুরু করলাম। যেমন তেমন কান্না নয়, শাস্তি পেয়ে যে কষ্ট পেয়েছিলাম, হুজুরের বিদায়ের কথা শুনে আরও বেশী কষ্ট পাচ্ছিলাম। কেননা হুজুর শাস্তি দিলেও এর অধিক মহব্বত করতেন। অবশেষে বাধ্য হয়ে হুজুরকে আবার নিয়ে আসা হলো। মোবাইলের যুগ ছিলো না। তাই সরাসরি হুজুরের বাড়ি গিয়ে অনুরোধ করে, আব্বা তাকে নিয়ে আসলেন। আল-হামদুলিল্লাহ।

দুই. আমি ৫ম শ্রেণীর ছাত্র। একবার চুল কাটতে সেলুনে গেলাম। ঐদিন একা গিয়েছিলাম। কেননা সেলুন বাসার পাশেই ছিলো। ছোট মানুষ। তবুও অনেকের হেয়ার স্টাইল দেখে মনে একটু শখ জাগলো। পছন্দের একটি স্টাইলে চুল কাটলাম। বিকেলবেলা আব্বা কোর্ট থেকে বাসায় ফিরলেন। আমার চুলের উপর তাঁর নজর পড়লো। কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর আমাকে নিয়ে বাসা থেকে বের হলেন। প্রায়ই আব্বার সাথে বের হতাম। মসজিদে সালাত আদায় ছাড়াও মাঝেমধ্যে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। দাওয়াত খেতে যেতাম। দ্বীনি মাহফিলেও অনেকবার সফর করেছি। তাই জিজ্ঞেস করার সাহস হয় নি, আব্বাজি! কোথায় যাবো? বাসা থেকে বের হয়ে সোজা সেলুনের পাশে গিয়ে তিনি থামলেন। অতঃপর আমাকে নিয়ে সেলুনের ভেতরে প্রবেশ করলেন। সেলুনের লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, আজ আমার ছেলের চুল কে কেটে দিয়েছো? একজন বললো, জ্বী, আমি। তিনি বললেন, সে কী টাকা কম দিয়েছে? জবাব, জ্বী না। তিনি বললেন, তাহলে তুমি আমার ছেলেকে ঠকালে কেন? টাকা ঠিকঠাক মতো দেয়ার পরও চুল লম্বা এবং এরকম কেন? আমি নিশ্চুপ। কোনো কথাবার্তা নেই। এরপর আব্বা বললেন, আমার ছেলের চুল খুব সুন্দর করে কেটে দাও। চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, আমি সামনে আছি। এবার ভালো করে কেটে দাও। সুন্দর ভদ্র ছেলের মতো বসে পড়লাম। গ্লাসে তাকিয়ে দেখছিলাম, কিভাবে শখের চুলগুলো ছোট হয়ে আসছিলো। ভুলতে পারি নি। আজও অম্লান সেই স্মৃতি প্রেরণা যোগায়।

সম্প্রতি লক্ষীপুর জেলার এক মাদ্রাসায় শিক্ষক কর্তৃক ৬ জন ছাত্রের চুল কেটে দেয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এমনকি ঐ শিক্ষককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একজন অভিভাবক বাদী হয়ে মামলা করেছেন। দৈনিক নয়াদিগন্তে (অনলাইন) প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায় যে, অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষক মঞ্জুরুল কবির মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে বলেন, ১০ম শ্রেণীর ওই ছাত্ররা ক্লাসের শৃঙ্খলাভঙ করে আসছে। এ জন্য তাদের অল্প করে চুল কেটে দেয়া হয়েছে। বাকি চুল তারা সেলুনে কেটেছে। তবে এ নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো অসন্তোষ নেই। ওই শিক্ষার্থীরা জানান, বুধবার তাদের ইংরেজি ক্লাস চলছিল। এ সময় হঠাৎ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মঞ্জুরুল কবির কাঁচি দিয়ে তাদের ছয়জনের মাথার চুল কেটে দেন। ঘটনার পর সহপাঠীদের সামনে লজ্জিত হয়ে তারা ক্লাস না করে মাদরাসা থেকে বেরিয়ে যান।

ঢাকা ট্রিবিউন (অক্টোবর ৯, ২০২১)-এ প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায় যে, শুক্রবার (৮ অক্টোবর) রাতে ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থীর মা বাদী হয়ে শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেছেন। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় ছয় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর চুল কেটে দেওয়ার ঘটনায় মাদ্রাসাটির শিক্ষক মঞ্জুরুল কবির মঞ্জুরের নামে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। শনিবার (৯ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল জলিল সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন। শুক্রবার (৮ অক্টোবর) রাতে ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থীর মা বাদী হয়ে শিশু নির্যাতন দমন আইনে এ মামলা দায়ের করেন। আবদুল জলিল জানান, ওই শিক্ষককে মামলাটিতে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এর আগে শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার বামনী ইউনিয়নের কাজিরদিঘিরপাড় এলাকা থেকে তাকে আটক করে পুলিশ।

সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সুপরিচিত ইসলামী চিন্তাবিদ শায়খ প্রফেসর মোখতার আহমাদের মন্তব্য: চুল কাটার মধ্যেও বখাটেপনা লুকিয়ে থাকে। আদর্শ শিক্ষার কাজ হচ্ছে শিক্ষার্থীদেরকে টোটাল লাইফস্টাইল শেখানো। একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু কেতাবই পড়ান না, তিনি মূল্যবোধ শেখান, শিক্ষার্থীদের মানুষ বানান। কেবল পুঁথিগত শিক্ষা সমাজকে কিছু তথাকথিত শিক্ষিত লোক উপহার দিতে পারে, যেখানে মনুষ্যত্ব, মানবিকতা, মূল্যবোধ ইত্যাদি গৌণ। মূল্যবোধবিবর্জিত শিক্ষার অভাবে আজকের বিশ্ব বিপর্যস্ত। শিক্ষকদেরকে তাদের কাজ করতে দিতে হয়, শিক্ষার্থিদের মানুষ বানানোর, মূল্যোবোধ শেখানোর কাজ। অন্যথায় শিক্ষা ও সমাজ সবকিছুই উচ্ছন্নে যায়। রাস্তায় ঘুরে দেখুন, চুলের স্টাইল দেখেই বলে দিতে পারবেন কে বখে গিয়েছে, বখাটে হয়ে যাচ্ছে। বখাটেদের মত চুল রাখায় শিক্ষক যেকোন শিক্ষার্থীকে শাসন করার নৈতিক অধিকার রাখেন। সেখানে আইনের হস্তক্ষেপ চলে না। অন্যথায়, শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য ব্যহত হয়, অনৈতিকতাকে আশ্রয়-প্রশ্রয়-প্রমোট করা হয়। এখন থেকে বিশ-তিরিশ বছর আগেও সমাজের মুরুব্বীগণ বখাটেপ্রবণ, উচ্ছন্নে যাওয়া যুবাদের শাসন করতে, চুলে কেটে দিতে পারতেন। শিক্ষার্থীদের চুল কেটে দেয়ার অপরাধে শিক্ষককে আটক করার ঘটনা সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি ভুল ম্যাসেজ দিল। কিছুদিন পর নৈতিকতার শাসনের কারণে পিতামাতকে আটক করা হলেও হয়তো সমাজ অবাক হবে না। সমাজ, রাষ্ট্র, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি। (নয়াদিগন্ত)

বিষয়টি নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের প্রত্যেককেই গুরুত্বসহকারে চিন্তা করতে হবে। বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষক আর ছাত্রদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার মেলবন্ধন অটুট থাকা জরুরী। ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ অতি জরুরী। একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং উদারতা মানসিকতা লালন একান্ত প্রয়োজন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বুঝেশুনে এগিয়ে যেতে হবে। শিক্ষার্থীদের উপলব্ধি করতে হবে যে, শিক্ষকরা কখনোই তাদের অকল্যাণ চাইতে পারেন না। ব্যতিক্রম তো থাকতেই পারে। তা উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করা মোটেও সমীচীন নয়। অভিভাবকদের ভাবতে হবে। আরেকটু সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। দয়াকরে ভুলে যাওয়া উচিৎ নয়। তাদের ব্যাপারে সন্তানদের মাঝে ইতিবাচক ধারণা দেয়ার চেষ্টা করুন। আপনার ও আপনার সন্তানের কল্যাণ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিন।

শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রদের চুল এভাবে কাটা সমর্থনযোগ্য নয়। আবার একজন শিক্ষককে এরকম অপদস্ত করা হবে, তাও মেনে নেয়া কষ্টকর। মিডিয়ায় এরকম নিউজ প্রায়ই চোখে পড়ছে যে, বিভিন্ন জায়গায় বখাটেদের চুল কেটে দেয়া হচ্ছে। যেমন: দুই শতাধিক বখাটের বড়-রঙিন চুল কেটে দিল পুলিশ! এরকম একটি নিউজ ২ মার্চ ২০২১ ইং, ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকমে প্রকাশিত হয়েছে। চাঁদপুরে অভিভাবক, স্কুল, কলেজপড়ুয়া ছাত্রী ও এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে বখাটে-ইভটিজারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে পুরানবাজার পুলিশ ফাঁড়ি। গত সাতদিন ধরে সতর্কতামূলক হিসেবে বখাটে ইভটিজারদের বড় ও রঙিন চুল কর্তন করেছে পুলিশ। এ পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক বখাটেদের বড় ও রঙিন চুল কর্তন করা হয়েছে। এ সময় বখাটেদের অভিভাবকদের সন্তানের ওপর নজর রাখতে ফাঁড়িতে ডেকে এনে সর্তক করে পুলিশ। পুরানবাজার পুলিশ ফাঁড়ির অর্থায়নে পুরানবাজারের বিভিন্ন সেলুনে বড় চুল ছোট ও রঙিন চুল কালো করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে পুরানবাজারের এক অভিভাবক জানান, আমার ছেলে আমার কথা শোনে না। সে চুল কালার করেছে। চুলের জন্য তার চেহারা দেখা যায় না। তাকে চুল কাটতে বললে সে গালমন্দ করে। তাই ফাঁড়িতে মৌখিক অভিযোগ করেছি। পুরানবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আলম জানান, বখাটে, ইভটিজারদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিছু উঠতি বয়সী কিশোরেরা রোমিও সাজতে বড় চুল রেখে রঙিন কালার করে বাজে আড্ডা দেয়া, ইভটিজিং করাসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। এসব বখাটেদের ব্যাপারে অভিভাবক, স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী ও এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে নিজেদের অর্থায়নে প্রায় দুই শতাধিক ছেলের চুল ছোট করে দেয়া হয়েছে। এটা সর্তকতামূলকভাবে করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর কোনো শিক্ষার্থী ও উঠতি বয়সী কিশোর রাস্তায় পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এই পদক্ষেপগুলো বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। অনেকেই বাহবা দিয়েছেন। ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। আসলে আমরা সবাই, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। কথা ও কাজে সুনাগরিক হিসেবে দেখতে চাই। তাই ইতিবাচক চিন্তাভাবনা হৃদয়ে লালন করি।

কবি কাদের নেওয়াজ রচিত একটি বিখ্যাত কবিতা- শিক্ষকের মর্যাদা। ছোটবেলায় যে কবিতাটি আমাদের অন্তরে শিক্ষকদের প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা বাড়িয়ে দিয়েছিলো। আমরা চাই, নতুন প্রজন্মের মাঝে সেই চর্চা অব্যাহত থাকুক। ছাত্রদের মন ও মননে শিক্ষকদের প্রতি ঘৃণা নয়, শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা জাগরূক থাকুক। শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ, বাস্তবতা মেনে, আসুন- দূরদর্শী ভূমিকায় অবতীর্ণ হই। সাম্প্রতিক দুঃখজনক ঘটনায় মামলা দায়েরকারী বাদী অভিভাবকের প্রতি বিনীত আহবান- মামলা তুলে নিন। শিক্ষকের মর্যাদা বুলন্দ রাখতে সহযোগিতা করুন। আল্লাহ তা’য়ালা! আপনার মর্যাদাও বাড়িয়ে দেবেন, ইন শা আল্লাহ।

[লেখক: সহকারী মহাসচিব, বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন।]

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *