চলে গেলেন সিলেটের সুপ্রসিদ্ধ আলেমেদ্বীন মাওলানা আ.ফ.ম আব্দুর রহমান।

মুক্তমত

 

মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ারঃ

২৫ অক্টোবর ২০২১ ইং। সোমবার। সকালে ফেসবুক লগ ইন করার সাথে সাথেই একটি স্ট্যাটাস চোখে পড়লো। স্নেহাস্পদ কামরুল হুদা ফুদায়েল লিখেছে, আমার আল্লাহ আমার আব্বাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। স্ট্যাটাসটি দেখার পর কিছুক্ষণের জন্য পুরো শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিলো। বৃহত্তর সিলেটের সুপ্রসিদ্ধ আলেমেদ্বীন মাওলানা আ.ফ.ম আব্দুর রহমান ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর কলিজার টুকরো ছেলে, প্রিয় ভাই ফুদায়েলের ঐ স্ট্যাটাসটি দেখার পর থেকে খুবই কষ্ট হচ্ছিলো এবং অসংখ্য অগণিত স্মৃতি চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিলো। আমার শ্রদ্ধেয় ও প্রাণাধিক প্রিয় উস্তায দুনিয়াতে নেই। এরকম একটি সংবাদ গ্রহণ করা ও মেনে নেয়া কষ্টকর। তারপরও মেনে নিতে হয়। আল্লাহ তা’য়ালার ফয়সালাই চূড়ান্ত।

১২ টার পর সিলেট মহানগরীর আখালিয়া নতুন বাজারের পাশে খাদ্বরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত শ্রদ্ধেয় উস্তাযের বাসায় পৌঁছলাম। গেটেই দেখা হলো তাঁর মেজো ছেলে, প্রিয় হাফিজ নাজমুল হুদা তোফায়েল ভাই ও ছোট ছেলে, প্রিয় ভাই কামরুল হুদা ফুদায়েলের সাথে। তাদের সাথে দেখা হতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। চোখের পানি নিয়ন্ত্রণ হারালো। স্বাভাবিক থাকাটা সম্ভবপর হয় নি। প্রিয় তোফায়েল ভাই জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, ভাই! আব্বা আপনাকে খুব মহব্বত করতেন। পছন্দ করতেন। আপনার প্রশংসা করতেন। অত:পর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করলাম। চেহারায় কী যে সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে! সুবহানাল্লাহ। দেখে মনে হচ্ছিলো একজন জান্নাতী মু’মীন যেন ঘুমিয়ে আছেন। পবিত্র কপালে চুমু দিয়ে হৃদয়কে প্রশান্তি দেয়ার চেষ্টা করলাম।

বাসার ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম, শ্রদ্ধেয় উস্তাযের আত্মীয়-স্বজন ও অনেক পরিচিতজন বসে আছেন। তন্মধ্যে অন্যতম আমার শ্রদ্ধেয় উস্তায শায়খুল হাদীস আল্লামা ইসহাক আল মাদানী। তাঁর পবিত্র জবান থেকে শ্রদ্ধেয় উস্তায মরহুম মাওলানা আ.ফ.ম আব্দুর রহমান সাহেবের ব্যাপারে জানার আগ্রহ ছিলো। সেই আগ্রহ বাস্তবতায় রূপ নিলো। তিনি কথা বলার ফাঁকে তাঁর ব্যাপারে একটানা প্রায় ১৫-২০ মিনিট বললেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, মরহুম মাওলানা আব্দুর রহমান বৃহত্তর সিলেটের সুপ্রসিদ্ধ একজন আলেমেদ্বীন। এরকম বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আলেমেদ্বীন, আমি আমার জীবদ্দশায় কম দেখেছি। তিনি একাধারে একজন ভালো মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও মুফতি। আরবী ব্যাকরণের ব্যাপারে তাঁর প্রখর ও নিখুঁত জ্ঞান দেখে আমি মুগ্ধ হতাম। নাহু সরফের ব্যাপারে তিনি পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। ফারায়িদ সম্পর্কে তাঁর স্বচ্ছ ধারণা ছিলো। বালাগাত মানতিকে তাঁর পারদর্শিতা দেখে বিস্মিত হতাম। তাঁর ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, মরহুম মাওলানা আব্দুর রহমান একজন মুত্তাকী লোক ছিলেন। তিনি ছিলেন মুখলিস দা’য়ী ইলাল্লাহ। একজন নির্লোভ ব্যক্তি। অহংকারী নয়, বরং সহজ সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষ। তিনি স্পষ্টভাষী ব্যক্তি। হক্ব কথা অকপটে বলতে অভ্যস্ত ছিলেন। হক্ব কথা বলতে মোটেও দ্বিধা কর‍তেন না। তিনি ছাত্রদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন। সহজেই সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। অনেক ছাত্রকে দেখেছি, তাঁকে বাবার মতো শ্রদ্ধা ও মহব্বত করতো। তাঁর স্বাভাবিক চলাফেরায় বুঝার উপায় ছিলো না যে, তিনি কতো উঁচু মাপের আলেম ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ একজন মানুষ।

দ্বীনের আলো ছাত্রসমাজের অন্তরে জ্বালবার নিয়্যাতে ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পর, মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার অন্তর্গত নিজ এলাকা শাহবাজপুর ত্যাগ করে তিনি চলে আসেন সিলেটে। শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা পাঠানটুলা, সিলেটে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষক থেকে অধ্যাপক পর্যায় পর্যন্ত একটানা ৩৫ বছর জামেয়ায় কর্মরত ছিলেন। তাঁর হাজারো ছাত্র আজ দেশ-বিদেশে সুনামের সাথে নানা দায়িত্বপালন করে যাচ্ছেন। অনেকেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, মুফতি ও শিক্ষক হিসেবে খেদমতে নিয়োজিত আছেন। দাওয়াতে দ্বীনের ময়দানে অনেকেই ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। নানা পেশায় অনেকেই সুখ্যাতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

মরহুম মাওলানা আব্দুর রহমান একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষার্থীদের মাঝে কিভাবে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে হয়, তিনি তাঁর জীবনে তা দেখিয়ে গিয়েছেন। কঠিন বিষয়গুলো এতো সহজে তিনি উপস্থাপন করতেন, শিক্ষার্থীরা খুব সহজে তা উপলব্ধি করতে পারতো। ফাযিল কামিল ক্লাসের শিক্ষার্থীদের নিকট যেভাবে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় ছিলেন, একইভাবে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছেও তিনি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন। একসময় তিনি সপ্তম, অষ্টম শ্রেণীতেও ক্লাস নিতেন। ২৫ বছর আগের দু’একটি ক্লাসের স্মৃতি আজও ভুলতে পারি নি। কুরআন মাজীদ পড়াতে গিয়ে তিনি কতই না সুন্দর ও সহজ করে আমাদের বুঝাতেন। পরবর্তী সময়েও প্রতিটি ধাপে তাঁর কাছ থেকে শিখেছি। অনুপ্রাণিত হয়েছি। যাদের ক্লাসে আমরা খুবই মনোযোগী ছিলাম, তন্মধ্যে অন্যতম মরহুম মাওলানা আব্দুর রহমান। মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমরা তাঁর ক্লাসগুলো উপভোগ করতাম। শেখার চেষ্টা কর‍তাম।

জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী; তারপর তোমরা আমারই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। [২৯. সূরা আল-আনকাবুত: ৫৭]। হিজরতের পথে প্রথম বাধা হলো, মৃত্যুর ভয়। স্বদেশ পরিত্যাগ করে অন্যত্র যাবার মধ্যে মানুষ প্রথম যে সমস্যাটির সম্মুখীন হয় তা হলো, নিজের প্রাণের আশংকা। স্বদেশ ত্যাগ করে অন্যত্র রওয়ানা হলে পথিমধ্যে স্থানীয় কাফেরদের সাথেও প্রাণঘাতী সংঘর্ষের আশংকা বিদ্যমান থাকে। আয়াতে এই আশংকার জওয়াব দেয়া হয়েছে যে, জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কেউ কোথাও কোন অবস্থাতেই মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা পাবে না। কাজেই মৃত্যুর ভয়ে অস্থির হওয়া মুমিনের কাজ হতে পারে না। তাই স্বস্থানে থাকা অথবা হিজরত করে অন্যত্র চলে যাওয়ার মধ্যে মৃত্যুর ভয় অন্তরায় না হওয়া উচিত। [ফাতহুল কাদীর]। আসলে যে যেখানেই থাকি না কেন, মৃত্যু নির্ধারিত সময়ে আসবেই। মৃত্যু থেকে পালানোর সুযোগ নেই। ৬২. সূরা জুমুয়ার ৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা জানিয়ে দিয়েছেন: বলুন, তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন করো, সেই মৃত্যুর সাথে তোমাদের অবশ্যই সাক্ষাৎ হবে। অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা (আল্লাহ)র নিকট এবং তোমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হবে, যা তোমরা করতে।

যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্য; কে তোমাদের মধ্যে কর্মে সর্বোত্তম? আর তিনি পরাক্রমশালী, বড় ক্ষমাশীল। [৬৭. সূরা মুলক: ২]। রূহ (আত্মা) একটি এমন অদৃশ্যমান বস্তু যে, যে দেহের সাথে তার সম্পর্ক বহাল থাকে, তাকে জীবিত বলা হয়। আর যে দেহ হতে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়, তাকে মৃত্যুর শিকার হতে হয়। জীবনের পর রয়েছে মৃত্যু। আল্লাহ তা’য়ালা ক্ষণস্থায়ী এই জীবনের ব্যবস্থা এই জন্য করেছেন, যাতে তিনি পরীক্ষা করতে পারেন যে, এই জীবনের সদ্ব্যবহার কে করে? যে এ জীবনকে ঈমান ও আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করবে, তার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান এবং যে এর অন্যথা করবে, তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]। তাই আসুন, অনন্তকালের জগতে সফলতার আশায় আল্লাহ তা’য়ালার প্রকৃত গোলাম হই। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসারী হওয়ার চেষ্টা করি। কুরআন, হাদীস-সুন্নাহ’র আলোকে জীবন গড়ি।

[লেখক: সহকারী মহাসচিব, বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন।]

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *