কালের আবর্তে হারিয়ে যাওয়া পেশা -ড. মো. আব্দুল হামিদ।

মুক্তমত

 

একসময় লেখাপড়া জানা মানুষের সংখ্যা কম ছিল; পরিবহন ও যোগাযোগে ছিল নানা সীমাবদ্ধতা। তাই পেশা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজ নিজ অঞ্চলকেন্দ্রিক ভাবনা অগ্রাধিকার পেত। অধিকাংশ ব্যক্তি পৈতৃক পেশায় থাকতেই পছন্দ করত। ফলে জীবন ও জীবিকার ধরনে দেশের প্রায় প্রত্যেক অঞ্চলে স্বাতন্ত্র্য লক্ষ করা যেত।

পেশাকেন্দ্রিক ভাবনায় গত কয়েক দশকে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই বহু পেশার ক্ষেত্র হয়েছে সংকুচিত বা বিলুপ্ত। একসময়ের অতি দক্ষ ও ব্যস্ত মানুষটি হয়তো আজ কর্মহীন। অথবা অন্য পেশায় যুক্ত হওয়ার লড়াইয়ে শামিল রয়েছেন। এ বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরাই আজকের নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

শৈশবে দেখেছি গ্রামের অধিকাংশ পরিবারে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর লক্ষ্য থাকত সীমিত। প্রাইমারি বা হাই স্কুল পর্যন্ত যেত চিঠিপত্র পড়া ও হিসাব-নিকাশ রাখা শিখতে। তাছাড়া অন্যেরা সহসা যেন তাদের ঠকাতে না পারে, সে ব্যাপারে চোখ-কান খোলাও উদ্দেশ্য থাকত।

মা-বাবা জানত সন্তানরা লেখাপড়া শিখে জজ-ব্যারিস্টার হবে না। একেবারে ব-কলম থাকলে কেমন দেখায়। অন্তত জমি-জাতির কাগজপত্র যেন পড়তে পারে, টিপসই দিতে না হয় অথবা লোকে যেন তার সন্তানদের মূর্খ না বলে—এমন সব কারণেই ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাত। পাশাপাশি সচেতনভাবে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া পেশায় ক্রমান্বয়ে যুক্ত করত।

তখনকার দিনে বিশেষ কাজের জন্য একেক পরিবার, গোষ্ঠী বা এলাকার সুনাম ছিল। নির্দিষ্ট পাড়া বা মহল্লায় স্বতন্ত্রভাবে তাদের বসবাসের প্রবণতাও দেখা যেত। সে কারণেই কামারপাড়া, কুমারপাড়া, তাঁতিপাড়া, হালদারপাড়া প্রভৃতি নাম এখনো শোনা যায়।

কিন্তু প্রযুক্তির প্রবল দাপট, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, উত্তরাধিকার সংকট, চাহিদা-জোগানে গরমিল, কাঁচামালের অভাব, বিকল্প পণ্যের উপস্থিতি বিবিধ কারণে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা পেশাগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

ফলে বহু প্রজন্ম ধরে অর্জিত দক্ষতাগুলো বিলীন হওয়ার পথে। অন্যদিকে তাদের সন্তানরা এসে ভিড় করছে চাকরির বাজারে। ফলে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক নানা ঐতিহ্য বিলুপ্ত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি বঞ্চিত হচ্ছে তাদের অবদান থেকে।

মাটির তৈজসপত্র তৈরির নিপুণ কারিগর কুমার সম্প্রদায় আজ অ্যালুমিনিয়াম, লোহা ও প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা এখনো শৌখিন কিছু মৃৎপাত্র তৈরি করছে। কিন্তু তাদের সন্তানদের আর ওই কাজ শেখাতে চান না। কারণ সেই পেশায় ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কারণ দেখছেন না।

অন্যদিকে সস্তা চীনা পণ্যের প্রভাবে কামাররা হয়ে পড়ছেন কর্মহীন। কৃষিকাজেও আধুনিক যন্ত্রপাতি আসায় তাদের আর লাঙলের ফলা ধারালো করার ডাক পড়ছে না। জেলেদের জায়গা দখল করছেন ইজারাদার ও বড় মাছ ব্যবসায়ীরা। প্রায় সব নদীতে অসংখ্য সেতু হয়ে যাওয়ায় বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দের ছন্দে সেভাবে আর মাঝিদের কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান শোনা যায় না।

আগে মানুষের আর্থিক সামর্থ্য কম থাকায় জুতা-স্যান্ডেল মেরামত করতে মুচির কাছে যেত। এখন তার খুব একটা দরকার হয় না। বাইরে জুতা পলিশ করার চর্চাও বেশ কমেছে। ফলে তাদের সংখ্যাও কমছে দ্রুতগতিতে। অন্যদিকে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও সাজসজ্জার দাপটে বংশীয় নাপিতদের কোণঠাসা অবস্থা।

এখন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বেশি বিনিয়োগ করে দোকান সাজাচ্ছেন, যন্ত্রপাতি কিনছেন। সেজন্য দৈনিক আয়ের সিংহভাগ অর্থ স্বভাবতই যাচ্ছে তাদের পকেটে। ফলে বংশপরম্পরায় ধরে রাখা পেশায় আর সন্তানদের আসতে দিতে চাইছেন না। তারা পড়ালেখা করে শহরে গিয়ে একটা ভালো কিছু করুক, এটাই তাদের প্রত্যাশা।

একসময় ঘোষেরা অনেক গরু পালত, এলাকায় দুধ বিক্রি করত। ঘি তৈরির ক্ষেত্রে তাদের ছিল বিশেষ দক্ষতা। এমনকি তাদের ঘোল বা মাঠাও ছিল গ্রামের মানুষের অতিপ্রিয়। এখন অ্যাগ্রো ফার্মগুলো ব্যাপক উৎপাদন ও বণ্টনে আসায় ঘোষ সম্প্রদায়ের লোকেরা আর টিকতে পারছে না।

মিষ্টি তৈরির কারিগর হিসেবে প্রত্যেক এলাকায় খ্যাতিমান কিছু ময়রা ছিল। এলাকার বিয়েশাদি বা অন্যান্য অনুষ্ঠান তাদের মিষ্টি ছাড়া হতোই না। এখন খ্যাতিমান সব ব্র্যান্ডের দাপটে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। অনেকে পৈতৃক পেশায় এরই মধ্যে ইস্তফা দিয়েছেন। কারণ হিসেবে বলছেন, আয় ও ব্যয়ের হিসাব মিলছে না।

দেশের কিছু (যেমন কুষ্টিয়া, পাবনা) অঞ্চল ছিল, যেখানে তাঁতের কাপড় খুব ভালো হতো। এখনো সেই ধারা কিছুটা বজায় রয়েছে। তবে বস্ত্রকল ও তৈরি পোশাকের দাপটের যুগে তাঁতিদের অনেকেই অসহায় বোধ করছেন। বহু তাঁত দীর্ঘদিন থেকে আর ঘুরছে না। সন্তানরা শহরে নানা পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

অন্যদিকে কাঠের ঘানি থেকে তিল-সরিষা-রাইয়ের তেল প্রস্তুতকারী সাজিদের (বা শাহ) অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। এখন স্বয়ংক্রিয় মেশিনে প্রস্তুতকৃত তেলের পাশাপাশি সয়াবিন, পাম অয়েল, অলিভ অয়েলের সরবরাহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে দুই-চারটা ঘানি সচল আছে, সেগুলোরও নিবু নিবু অবস্থা।

আগের মৌয়ালদের মধু সংগ্রহের জায়গা দখল করেছেন আধুনিক মৌ-চাষীরা। তারা টিকে থাকার স্বার্থে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন। মৌমাছির ক্ষতি না করে মধু সংগ্রহের প্রাচীন বিদ্যা হচ্ছে বিলুপ্ত। শীত মৌসুমে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করা গাছির সংখ্যাও বেশ দ্রুত কমছে।

কুটির শিল্পের অন্তর্গত মুড়ি-মুড়কি-বাতাসা-খই-মোয়া ইত্যাদি তৈরি করা পরিবারগুলো সীমিত পরিসরে সেগুলো চালু রেখেছে। তবে খুব একটা পোষাচ্ছে না। ফলে যারা ওই পেশায় বর্তমান, তারাও চায় পরবর্তী প্রজন্ম যেন লেখাপড়া শিখে অন্য পেশায় যায়।

একসময় প্রত্যেক অঞ্চলে বেকারিতে ব্রেড-বিস্কুট-কেক তৈরি হতো। সেগুলোয় আশেপাশের এলাকার চাহিদা পূরণ হতো। স্থানীয় মুখরোচক নানা খাবার কারিগরের নামে পরিচিত ছিল। মানুষ হাটের দিন সেগুলো কেনার জন্য অপেক্ষায় থাকত। ওইসব পণ্য প্রস্তুতে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের পাশাপাশি কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হতো।

কিন্তু এখন সেগুলো বড় প্রতিষ্ঠানের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এখনকার শিশুরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মিষ্টান্ন বা মুখরোচক খাবারের জন্য বায়না ধরে না। বরং টেলিভিশনে দেখানো শরীরের জন্য ক্ষতিকর চিপস, জুস, ললিপপ পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

একসময় ট্রেন-বাস-ফেরিতে চলাচলের সময় অসংখ্য হকার দেখা যেত। তারা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের লোকদের জন্য নানা পণ্য অফার করত। হাটে-বন্দরে মজমা বসিয়ে কবিরাজি ওষুধ বা তাবিজ-কবজ বিক্রি করতেও প্রায়ই দেখা যেত। তাদের ছন্দময় কথা ও লেকচার মানুষকে মুগ্ধ করত।

এমনকি উচ্চশিক্ষিত লোকজনও শখ করে তেমন পেশায় যেত। আমাদের এলাকায় রঞ্জিত বাবু নামে এক হকার ছিলেন। শোনা যায়, তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও হকারি করতেন। তার মজমায় শুধু তার কথা শোনার জন্য লোকে ভিড় করত! আজকাল তাদের সংখ্যাও দ্রুত কমছে।

গ্রামাঞ্চলে ফেরিওয়ালাদের সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে। বাহারি জিনিসপত্র ফেরি করে বেড়ানোর দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। একসময় তারা সাধারণ মানুষের কাছে সস্তা পণ্যের বড় সরবরাহকারী ছিল। আইসক্রিম বিক্রেতার ঘণ্টাধ্বনি এখন আর খুব একটা শোনা যায় না। কুলফি মালাইয়ের অনন্য সংরক্ষণ ও পরিবেশন পদ্ধতির সঙ্গে এখনকার শিশুরা মোটেই পরিচিত নয়।

ছোটবেলা হাটে দেখতাম তামা-কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্র কিছু লোক নিপুণ দক্ষতায় মেরামত করত। তাদের বলত ঠাটারু। আজ ওসব পাত্রের ব্যবহারই উঠে গেছে। ফলে তাদের টিকে থাকার কারণ নেই। বড় ব্যবসায়ীদের দাপটে ক্ষুদ্র স্বর্ণকারদের পক্ষেও টিকে থাকা মুশকিল হচ্ছে। কারণ মেশিনের সাহায্যে নিখুঁতভাবে তৈরি অলংকারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারছেন না।

কিছু মানুষ ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরি করে নিজেরাই হাটে সেগুলো বিক্রি করত। পান খেতে অভ্যস্ত মানুষেরা পুরোপুরি তাদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আজকাল তারাও (চুনারু) প্রায় বিলুপ্তির পথে। শিল-পাটা কিংবা চাকু ধার দেয়া লোকদেরও দেখা মেলে কালেভদ্রে।

একসময় ছেলেদের সুন্নতে খৎনা করানোর জন্য প্রত্যেক এলাকায় নামকরা এক-দুজন হাজাম থাকত। তাদের আসতে দেখলেই শিশু-কিশোররা ছুটে পালাত; বড়রা শ্রদ্ধাভরে সালাম দিত। আবার প্রসূতি সেবা কিংবা সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে দেখা যেত দাইমা। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়ালেখা কিংবা প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিপুণ দক্ষতায়, পরম মমতায় তারা বছরের পর বছর কাজগুলো করত। এখন হাসপাতাল ও ক্লিনিক সেবার সহজলভ্যতায় তাদেরও প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় এমন আরো কত পেশা যে হারিয়ে গেছে, কে তার খবর রাখে!

একসময় ঈদ-পূজা-বিয়ের উৎসব তাদের হাতের স্পর্শ ছাড়া পূর্ণতা পেত না। সেই দর্জিদের কাজের ক্ষেত্রও ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। প্রত্যেক এলাকায় তাদের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। কারণ ক্রেতারা তৈরি পোশাকে অভ্যস্ত হওয়া, পুরনো কাপড় সেলাইয়ের প্রবণতা কমে যাওয়া, নিত্যনতুন ডিজাইনে আকৃষ্ট হওয়ায় তাদের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন হ্রাস পেয়েছে। অনেকেই জীবন-জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করেছে। কেউ কেউ গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে চাকরি নিয়েছে।

আগে ছাতা মেরামতকারী লোকেরা দূর-দূরান্ত থেকে আমাদের গ্রামে আসত। তাদের ভাঙা বা অচল ছাতা স্বল্প সময়ে সচল করার দক্ষতা আমাদের মুগ্ধ করত। তাছাড়া তালা সারাইয়ের মিস্ত্রি দেখা যেত বেশ। ডুপ্লিকেট চাবি বানানো ছাড়াও অকেজো তালা ঠিক করার বিশেষ দক্ষতা তাদের ছিল।

ভাঙ্গাড়িওয়ালাদের পুরনো জিনিসপত্র দিয়ে বিনিময়ে কটকটি পাওয়া যেত। সেই মানুষগুলোর অনেকেই পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। ঘড়ি-রেডিও-টিভি মেকারদের ডিমান্ড ছিল চোখে পড়ার মতো। আজকাল মানুষ আর সেগুলো মেরামত করার কথা খুব একটা ভাবে না। বেশি সমস্যা হলে বদলে ফেলে। ফলে তাদের বিলুপ্তিও সময়ের ব্যাপার মাত্র।

মাত্র তিন দশক আগে টাইপিস্ট ও স্টেনোগ্রাফারদের চাহিদা ছিল কল্পনাতীত। আজকের প্রজন্ম এটা অনুমানই করতে পারবে না যে হাজার হাজার মানুষ শুধু টাইপ মেশিনের ওপর নির্ভর করে নিজেদের সংসার চালাত। প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে তাদের জায়গায় এখন কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু যারা বিচারালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট স্থানে চুক্তিভিত্তিক কাজ করতেন, তারা কালের স্রোতে হারিয়ে গেছেন। কর্মদক্ষতা থাকার পরেও তারা বেকার হয়ে পড়েছেন।

ডিজিটাল ব্যানার ও ইলেকট্রনিক সাইনবোর্ডের দাপটে হারিয়ে গেছেন বিভিন্ন এলাকার আর্টিস্ট ও চিত্রশিল্পীরা। গ্রামীণ পটুয়ারা এরই মধ্যে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। ঠিক তেমনিভাবে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে স্থানীয় বাউল-পালাগান-জারিগান ও যাত্রা শিল্পীদের সংখ্যা। তাদের পাশাপাশি ঢাকী, বংশীবাদক, হাটবাজারে লাঠিখেলা দেখানো সার্কাস কর্মী কিংবা নাটকের অভিনয় শিল্পীদের অবস্থা মোটেই ভালো নয়।

আধুনিক প্রযুক্তি পণ্যের ব্যাপক বিস্তারে আজ তাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। বাঁশ-বেত ও মৃৎপাত্রের কারুশিল্পীদের লড়াই করতে হচ্ছে দেশী-বিদেশী সুদৃশ্য সব রেডিমেট পণ্যের সঙ্গে। কোনো রকমে এখনো টিকে থাকলেও ঠিক কত দিন অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে তা বলা মুশকিল।

কাঠমিস্ত্রি ও রাজমিস্ত্রিদের কাজের আওতা বাড়লেও সাধারণ মিস্ত্রিদের চাহিদা কমছে। আধুনিক ধারার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং অর্থ বিনিয়োগ করে যারা আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনতে পারছে তারাই টিকে যাচ্ছে। অন্যেরা জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে দীর্ঘদিনের পেশা বদলে ফেলছে।

একসময় নগরজীবনে অপরিহার্য বাহন ঘোড়ার গাড়ি (টাঙ্গাওয়ালা) দেখতে এখন জাদুঘরে যেতে হয়। এমনকি পায়ে টানা রিকশাওয়ালার সংখ্যাও বেশ কমেছে। সেখানে অটোরিকশার দাপট লক্ষণীয়। আবার অটো রাইস মিলের দাপটে হাসকিং মিলগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আড়তদার, ফড়িয়া, বেপারি, দালালদের মতো অসংখ্য পেশার প্রয়োজন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

পাঠক হয়তো ভাবছেন, পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে অনেক কিছুই ছেড়ে দিতে হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। বাস্তবতার আলোকে নতুনকে স্বাগত জানাতে হবে, এটাই সংগত। তা ঠিক আছে। কিন্তু উপরের বর্ণনা থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

প্রথমত, আমাদের পেশা পছন্দের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। কারণ আজকের লোভনীয় পেশা কালের বিবর্তনে ফিকে হয়ে যেতে পারে। ফলে বর্তমান পেশায় অতি সফল হলেও নতুন প্রবণতার ব্যাপারে চোখ-কান খোলা রাখা দরকার। দ্বিতীয়ত, পরিবর্তনের গতি খুব বড় ফ্যাক্টর। আগে কয়েক প্রজন্মে যে পরিবর্তন হতো, এখন তা মাত্র কয়েক বছরেই হয়ে যাচ্ছে। ফলে গতির সঙ্গে তাল মেলানোর চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।

তৃতীয়ত, পছন্দের পেশায় যাওয়ার পর নিজের দক্ষতা উন্নয়নের ব্যাপারে উদাসীন হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ পরিবর্তিত প্রযুক্তি বা পরিস্থিতি আকস্মিক সেই পেশায় আপনাকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে। ফলে সারা জীবন শেখা ও সমৃদ্ধ হওয়ার ধারা চালু রাখতে হবে। নইলে পেশাগত ঝুঁকি বাড়বে। পেশা পরিবর্তনের ব্যাপারেও ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা দরকার। সারা জীবন একই পেশায় থাকার সুযোগ ক্রমেই হ্রাস পাবে।

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আমাদের বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। অথচ বিদ্যমান সিস্টেম তাদের নানা সেক্টরে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে না দিয়ে একক চ্যানেলে (জব মার্কেট) নিয়ে আসছে। এতে কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার তীব্রতা বাড়ছে।

পাশাপাশি বিদেশী ও কতিপয় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বাজার সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরীক্ষিত আদি, অকৃত্রিম, প্রাকৃতিক দ্রব্যের উৎসগুলো শুধু উত্তরাধিকারীদের অনীহার কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে একটা জাতির জন্য তা কল্যাণকর হতে পারে না।

ড. মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘পোস্ট ক্রাইসিস বিজনেস’ বইয়ের লেখক। উৎস: বণিকবার্তা, ২৩ নভেম্বর ২০২১।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *