কবর ও মাজার জিয়ারত।

ইসলাম ও জীবন

শরিয়তের আলোকে কবর জিয়ারত হচ্ছে, কোনো ঈমানদার মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং কবর বাসিকে সালাম প্রদান করা। নিসন্দেহে এটি একটি সাওয়াবের কাজ।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলেন, তার কারন সহিহ দ্বীনের জ্ঞানের অভাবে মানুষ মৃত ব্যক্তির কাছে মনের হাযত পূরণের উদ্দেশ্য সাহায্য চাইতো যা শিরক এর অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন —
ان الله لا يغفر ان يشرك به ويغفر ما دون ذالك لمن يشاء ومن يشرك بالله فقدافترى اثما عظيما.
অর্থাৎ— নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার সাথে কাউকে শরীক করার অপরাধ, কখনোই ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দেন।
আর আল্লাহর সাথে যে ব্যক্তি শিরক করল সে মহা পাপ করল। (সূরা নিসা আয়াত:৪৮)

পরবর্তীতে রাসুল (সাঃ) কবর যিয়ারত করতে মানা করেন নাই। তার কারন, যিয়ারতের মাধ্যমে জীবিত ও মৃত ব্যক্তির সাওয়াব হাসিল করার সুযোগ রয়েছে।

قال رسول الله(صلى) انى كنت نهيتكم عن زيارة القبور فزوروها.
রাসূল (সাঃ) বলেন- আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম এখন থেকে তোমরা কবর জিয়ারত কর।
(সুনানে মাসায়ী-৫৬৬৮)

মৃত ব্যক্তির জন্য কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া দুরুদ, পড়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে মাগফিরাত কামনা করা, যা সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত। জীবিত ব্যক্তির লাভ হলো কবর যিয়ারত করলে, মন নরম হয়, এবং ফিলিংস তৈরি হয় আমাকেও একদিন কবরে শুইতে হবে। সাওয়াল জাওয়াব এর সম্মুখীন হতে হবে।

•••″হযরত উসমান (রা) যখন কবরের পাশদিয়ে যেতেন।তার চোখ দিয়ে পানি পরে দাড়ি মোবারক ভিজে যেত,জিজ্ঞাস করা হলে তিনি বলতেন রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন— মানুষের মৃত্যুর পর প্রথম স্টেশন হচ্ছে কবর, এখানে রেহাই পাওয়া গেলে বাকি সব স্টেশনে রেহাই পাওয়া যাবে, আর এখানে আটকা পরে গেলে বাকি সব জায়গাতেই আটকা পড়তে হবে, যার কারনে কবরের পাশদিয়ে গেলে আমাকে কাঁদতে হয়”।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা কবর ও মাজার যিয়ারতের নামে কি দেখছি, একস্থান থেকে অন্যস্থানে যিয়ারতের নামে গাড়ি বাড়া করে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিনিয়তি দরগা, মাজার ও পীরের দরবারে যাতায়াত একটি দর্শনিয় কাজ ও মেলায় পরিনত হয়েছে।
··· হাদীসে বর্নিত হয়েছে:
لا تشدالرحال الا ثلاثة مساجد المسجدالحرام. المسجد القصى المسجد الرسول صلى..
রাসুল (সা) বলেন— শুধুমাত্র তিনটি মসজিদের জন্য জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মানুষ সফর করতে পারে মাসজিদুল হারাম, মাসজিদুল আক্বসা ও মাসজিদে নববী।

অত্যান্ত পরিতাপের বিষয় কবর ও মাজারকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো জায়গায় বার্ষিক উরুস মাহফিল হয়ে থাকে।উরুস আরবি তিনটি অক্ষরের সমষ্টি, উরুস সব্দের অর্থ বাসররাতের মিলন। এবং অলিমার খানা বা খুশি।তথা-কথিত পীর মুর্শিদ, ও তাদের মুরিদদের ভাষায় পীর বুজুর্গের মাজারে পীরের জন্ম-মৃত দিবস পালনের নামে জলসার আয়োজন করাকে উরুস বলে যা সাওয়াবের কাজ।

অথচ! উরুসের নামে কবর মাজার কেন্দ্রীক কোন অনুষ্ঠান বা তার ফজিলত দুর্বল হাদিস দ্বারাও প্রমানিত নয়। বরং পুরো অনুষ্ঠানে শিরক আর বিদআতি কর্মকান্ডে ভরা।

আরো আশ্চর্যের বিষয় যেখানে দুঃখ দুরদশা হতে মুক্তি লাভের আশায় বিভিন্ন নজর-নেওয়াজ হাদিয়া তুহফা তথা গরু ছাগল, ভেড়া,দুম্বা, উট ইত্যাদি প্রদান করা হয়ে থাকে, এতে পীর ও পীরের আওলাদের একটি অর্থ আয়ের অন্যতম মাধ্যম, পীরকে পীরবাবা, পীরের বউকে পীর-মা, সম্মান সুচক শব্দ দ্বারা আখ্যায়িত করা হয়। রাতের অন্ধকারে মদ, গাঁজা সেবন, নাচ, গানের আসর জমে উঠে। কোনো কোনো স্থানে পীরের পায়ে সিজদা দেয়া হয়, যা নিতান্ত ভন্ডামি শরিয়ত গর্হিত কার্যক্যালাপ ছাড়া কিছু নয়, যা সকালেরই জানা।এ জাতীয় কার্যক্যালাপ ঈমান আমল ও বিধর্মীদের বিশ্বাস আাকিদা সাথে কি পার্থক্য।

★একটি ইতিহাস মনে পড়ে গেল, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরু.(১৮৮৯-১৯৬৪) তার একটি বক্তব্য বাস্তবতার প্রমান পাওয়া যায়, আজমিরে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র) মাজারে গিয়ে সমবেত ভক্তদের উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষনে বলেছিলেন—”ভাইয়েরা! হিন্দু আওর মুসলিম ভারত মাতা কে দো সন্তান হ্যাঁয়। দূনূঁ মেঁ কোয়ী ফারাক্ব নেহী হ্যাঁ। স্রীফ এহি কে হিন্দু আপনে দেবতাহ কো সমনে রাখ্ কে পুঁজে কারতে হ্যাঁ, আওর মুসলিম আপনি মুরদোও কো মেট্রী কে নীচে ঢাঁক কর পূজেঁ করতে হ্যাঁ”।
অর্থাৎ- ভাইয়েরা আমার! হিন্দু ও মুসলিম ভারত মাতার দুই সন্তান। দু’জনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কেবল এতটুকু যে, হিন্দু তার দেবতাকে সামনে রেখে পুজা করে। আর মুসলিম তাদের মুর্দাকে মাটির নিচে (কবরে) রেখে পূজা করে।
এই বক্তব্য দ্বারা কবর ও মাজার পূজার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই তিনি বুঝিয়েছেন, নাউজুবিল্লাহি মিন-যালিক।
অথচ, আমাদের ঈমান আকিদা ও বিশ্বাস অন্যান্য ধর্ম থেকে সম্পুর্ন আলাদা।

তাই মাজার এবং কবর কেন্দ্রীক সকল প্রকার কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা ও ঈমান আক্বিদা কে ভ্রান্ত পথ থেকে সীরাত্বে মুস্তাকিম এর পথে পরিচালিত করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব, নতুবা দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নাই।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—
قل هل ننبؤكم بالاخسرين اعمالا° الذين ضل سعيهم في الحيوة الدنيا وهم يحسبون النهم يحسنون صنعا.
অর্থাৎঃ বলুন আমি কী তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দিব যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবিই ক্ষতিগ্রস্থ। তারাই সেসমস্ত লোক যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে বিভ্রান্ত, অথচ, তারা মনে করে যে তারা সৎকর্ম করেছে। (সূরায়ে কাহাফ-১০৩-১০৪)

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *