ওয়াজ—নসিহতে আজগুবি কিচ্ছা কাহিনী।

ইসলাম ও জীবন

🔸আজকের লেখা, ওয়াজ—নসিহতে
আজগুবি কিচ্ছা কাহিনীর বয়ান প্রসঙ্গে।
____________________________________________
ওয়াজ অর্থ নসিহত বা উপদেশ করা, একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মানে ও জাতি গঠনে ওয়াজ নসিহত নিসন্দেহে দ্বীনি দাওয়াতি কাজ। আল্লাহ তায়ালা নবী করিম (সা)কে আদেশ দিয়েছেন-
فذكر فان الذكراى تنفع المؤمنين
আপনি জনগণের মাঝে উপদেশ দিন, কেননা ওয়াজ নসিহতে মানুষের কল্যান হয়। আবার কুরআনুল কারিমে জনগণের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে— فاسالوا اهل الذكر ان كنتم لا تعلمون
তোমাদের অজানা বিষয় জ্ঞানিদের কাছ থেকে জেনে নাও।
রাসুল (সা) ইরশাদ করেছেন — بلغوا عنى ولو اية
আমার পক্ষ থেকে একটি কথা হলেও অন্যদের কাছে পৌঁছিয়ে দাও।
আলেম সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে কোরআন ও সহী সুন্নাহর আলোকে জনগণ কে ওয়াজ নসিহত করা, আলহামদুলিল্লাহ, হক্বানি উলামায়ে কেরাম এ দায়িত্ব আনজাম দিয়ে যাচ্ছেন।
এতে অতীতের তুলনায় এখন মানুষের মাঝে, ধর্মীয় মুল্যবোধ,ইসলামকে জানাশুনার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

তবে পরিতাপের বিষয়, কোনো কোনো আলেম, ওয়াজ নসিহতে কুরআন হাদিস ছাড়া মনগড়া, আজগুবি কিচ্ছা কাহিনি, হাদিসের নামে জাল হাদিস ও মিথ্যা গল্প চালিয়ে যাচ্ছেন। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইউটিউব, তথা ফেইসবুকেও পাওয়া যায় এজাতীয় ওয়াজ নসিহত থেকে জানগণের পরিবর্তন ও হেদায়তের আশা করা যায় না।

যার কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরছি ——

এক: قل هوالله এর আলোচনা —-
বক্তা আলোচনার শুরুতে قل هوالله তিলাওয়াত করলেন, প্রথমে মনে হচ্ছিল তিনি সুরা ইখলাসের আলোকে ওয়াজ করবেন। দেখা গেল বিপরীত বললেন, পিয়ারে হাযিরিন, যানেন এই সুরাটি কার উপরে নাজিল হয়েছে? জনগণ বলল না। তিনি বললেন আমাদের নবীর উপরে, তিনি হলেন হজরত হুসাইন এর নানা, হুসাইন যিনি কারবালায় শহীদ হয়েছেন, এবার শুরু হয়ে গেল কারবালার ঘটনা। চিন্তা করুন তো কোথায় قل هوالله আর কোথায় কারবালা, পাঠকবৃন্দ উপরোক্ত বিষয়টি শুনেছিলাম নন্দিত মুফাসসিরে কুরআনের মুখ থেকে পরবর্তীতে এক ওয়াইজির মুখ থেকে আমি নিজ কানে শুনে তার বাস্তবতা পেলাম।

দুই: ওয়াজে পীরের কেরামতি।
কোনো এক ব্যক্তি পীর সাহেব এর কাছে একটি সন্তানের জন্য তাবিজ চাইল, তিনি তাবিজ দিয়ে বললেন— এই নাও কোমরে বেধে রেখো, তাবিজের বিতরে বাচ্চার নাম দেওয়া আছে, জন্ম নিলে লিখা অনুযায়ী বাচ্চার নাম রাখিও, ওয়াইজ বলতেছেন, দেখছেন আমাদের পীরে সাহেবের কেরামতি, তিনি চাইলে বাচ্চা দিতে পারেন,
নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক
শ্রোতাদের মধ্যে সুবহানাল্লাহ মাশাআল্লাহর ধ্বনি রোল পরে গেল, অতচ, পীরের নিজের কোনো সন্তান নাই।

তিন: একবার শ্যমলী পরিবহনে বগুড়া যাচ্ছিলাম গাড়িতে নাটকের সিডি চলছিল, কিছুক্ষণ পর সুপারভাইজার ওয়াজের সিডি লাগালেন, মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম, আমি যাচ্ছিলাম একটি তাফসির মাহফিলে, ইচ্ছা হলো শিখার মতো কিছু হয়তো পাওয়া যাবে,
আস্তাগফিরুল্লাহ,আস্তাগফিরুল্লাহ,আস্তাগফিরুল্লাহ
বেটা ওয়াজে জংলার হরিণের কিচ্ছা বলছে।
পরের কাহিনী আর মারাত্মক, যা কুফরি মুলক কথা একজন পীর সাহেব নাকী তার এক মুরিদকে বলেছিলেন, আজ এশার নামাজ পড়বিনা মুরিদ নাকী খুব নামাজী ছিলেন, ভেবে চিন্তে নামাজ কাযা করাটা কেমন হয়,তাই পুরো নামাজ না পরে শুধু ফরজ পরে ঘুমিয়ে পড়লেন, রাত্রে নাকী নবী এসে তাকে বলেছেন শুধু আল্লাহর টা পড়লে, আর আমার টা বাদ দিলে, মুরিদের ঘটনাটি শুনে পীর সাহেব বললেন আরে বেকুফ ভেদের খবর আমি জানি, আজ আমার কথায় পুরো নামাজটা বাদ দিলে, তুই আল্লাহকে দেখতে পাইতে।নাউজুবিল্লাহ
এর পরে তিনি কচ্ছপের কেরামতির উপর ওয়াজ শুরু করলেন।
পাঠক ভায়েরা, আমি জানি না আপনারা হাসবেন না কাঁদবেন এজাতীয় হাজারো আজবগুবি কিচ্ছা কাহিনীর নামে ওয়াজ। লেখাটি লম্বা হয়ে যাবে এইজন্য ফিরিস্তি টানছিনা।

হয়তো অনেকে মনে করতে পারেন, ওয়াজ নসিহতে কিচ্ছা বলা দুষের কিছু না, কথাটা একদম ঠিক।
কুরআন হাদিসে অসংখ্য কিচ্ছা কাহিনীতে ভরা।
আল্লাহ তায়ালা সুরায়ে ইউসুফে احسن القصص
অর্থাৎ সর্বোত্তম সুন্দরতম কিচ্ছা কাহিনী বর্ণনা করছেন।
যা থেকে জাতি শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছু আছে।

চার: যারা নিজেদের হক্ব পন্থি, আলেমে রব্বানী, পীরে কামেল, মুরশিদে মুকাম্মিল দাবি করেন, ইদানীং দেখছি তারাও আজবগুবি কিচ্ছা কাহিনীর ওয়াজ করে চষে বেড়াচ্ছেন, কেউ বাঘের কিচ্ছা, কেউ সাপের কিচ্ছা, এমনকি কেয়ামতের দিন জাহাজ ভরে জান্নাতে যাওয়ার ফাজাইল বয়ান করছেন।

এইভাবে মনগড়া কাহিনী জাল হাদিস অনির্ভর কিচ্ছা কাহিনীর ওয়াজ নসিহত চলতে থাকলে, এজাতির পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব হবে।

অতএব ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের পরিবর্তনের জন্য আজগুবি কিচ্ছা কাহিনীর নামে ওয়াজ নসিহত না করে, কুরআন ও সহি—সুন্নাহর আলোকে তথ্য উপাত্ত ভিত্তিক বাস্তব ও যুক্তি নির্ভর উপদেশ প্রদান করা জাতি কামনা করে।

আল্লাহ তায়ালা বিষয়টিকে উপলব্ধি করার তাওফিক যেন দান করেন এটাই কামনা।
(وما علينا الاالبلاغ)

বিদ্রঃ (লিখাটি কাউকে আঘাত বা দোষারুপ করা উদ্দেশ্য নয়, আমার নিজেরই ইলম আমলের যতেষ্ট ঘাটতি, সমাজের অসংগতি ও সচেতনতাই সৃষ্টি করা উদ্দেশ্য)।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *