এফডিআরে কোন ব্যাংকে কত মুনাফা

ব্যবসা-বাণিজ্য

ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য সচেতন মানুষ ব্যাংকে স্থায়ী আমানত করেন। কিন্তু সব ব্যাংক একই ধরনের সুবিধা দেয় না। এক্ষেত্রে কষ্টার্জিত অর্থ কোন ব্যাংকে রাখলে একটু বেশি সুদ বা মুনাফা মিলবে তার খোঁজে থাকেন সঞ্চয়কারীরা।

প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা রাখাই হচ্ছে মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প বা ডিপিএস (ডিপোজিট পেনশন স্কিম)। ডিপিএস নামে বহুল প্রচলিত হলেও বিভিন্ন ব্যাংকে এর ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডিপিএসের বিপরীতে মাসিক, ত্রৈমাসিক, ছয় মাসিক ও বাৎসরিক সুদ দিয়ে থাকে।

সর্বনিম্ন তিন মাস থেকে তিন বছর বা তারও বেশি সময়ের জন্য ব্যাংকগুলোতে আমানত রাখার সুযোগ রয়েছে। আমানতের বিপরীতে যে সুদ দেয়, তার নাম ফিক্সড ডিপোজিট রেট বা স্থায়ী আমানতে সুদের হার (এফডিআর)।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ ২০২১ সালের জুলাই মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে কার্যরত ৫৯টি ব্যাংকের সুদের হার একরকম নয়। বিভিন্ন মেয়াদে সর্বনিম্ন এক শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত এফডিআরে সুদ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। মেয়াদি আমানতে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশও সুদ অফার করছে কয়েকটি ব্যাংক।

রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে মোট ৯টি রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংক রয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলো এফডিআরে বিভিন্ন মেয়াদে সাড়ে ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ পর্যন্ত সুদ অফার করছে। সাধারণ ডিপোজিটে সাড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশ সুদ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। আর তিন থেকে ছয় মাসের কম সময়ের ডিপোজিট রেট ৫ দশমিক ২৫ থেকে ৬ শতাংশ।

সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুদ দিচ্ছে বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। তিন থেকে ছয় মাসের কম সময়ের সুদ সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ, ছয় মাস থেকে এক বছরের কম সময়ের জন্য ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং এক বছর থেকে তিন বছরে মেয়াদি সময়ের সুদ ৫ দশমিক ৭৫ থেকে ৭ শতাংশ এবং তিন বছরের বেশি সময়ের ডিপোজিটের জন্য রাকাব ৬ থেকে ৯ শতাংশ সুদ অফার করছে।

এছাড়া সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, জনতা, বেসিক, বিডিবিএল, পিকেবি ও বিকেবি আমানতকারীদের ৫ দশমিক ২৫ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে।

বেসরকারি ব্যাংক

বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সাধারণ সঞ্চয়ে ২ থেকে চার শতাংশ সুদ রয়েছে। আর মেয়াদি আমানতে দিচ্ছে ৪ থেকে ৬ শতাংশ। তবে কিছু ব্যাংক মেয়াদি আমানতে সর্বোচ্চ ৭ থেকে ৮ শতাংশ সুদ অফার করেছে।

দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশকিছু ব্যাংক তিন মাস মেয়াদি আমানতে ৬ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ও মেঘনা ব্যাংক।

চতুর্থ প্রজন্মের পদ্মা (সাবেক ফারমার্স) ব্যাংকে তিন থেকে ছয় মাস কম সময়ের সুদ সাড়ে ৫ শতাংশ, আর সাউথবাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের (এসএবিসি) আড়াই শতাংশ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ।

এছাড়া তিন মাস মেয়াদি আমানতের ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে এবি ব্যাংক, আইএফআইসি, এনআরবি, এনআরবি কমার্শিয়াল এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম সুদ দিচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক। তিন মাস মেয়াদি আমানতে ব্যাংকটি সুদ দিচ্ছে এক থেকে দুই শতাংশ। আর ডাচ বাংলা ব্যাংক দিচ্ছে দুই থেকে আড়াই শতাংশ।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক

দেশের শরিয়াহভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্‌, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, শাহজালাল, এক্সিম, ইউনিয়ন, আইসিবি ইসলামিক, এনআরবি গ্লোবাল ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত ব্যাংকগুলো ৪ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ মুনাফা দিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি. বিভিন্ন মেয়াদি সঞ্চয়ের উপর মুনাফা দিচ্ছে ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে গ্লোবাল ইসলামী, আইসিবি ইসলামী ও ইউনিয়ন দিচ্ছে ৬ শতাংশ মুনাফা। আর ৪ শতাংশর নিচে মুনাফা দিচ্ছে আল-আরাফাহ্‌ ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, তারা দিচ্ছে মাত্র ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ মুনাফা।

বিদেশি ব্যাংক

বিদেশি ব্যাংকগুলো আমানতের উপর তেমন সুদ দেয় না। এ খাতের বেশিরভাগ ব্যাংক মেয়াদি আমানতে ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদ দিচ্ছে।

বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে তিন বছর থেকে তার বেশি সময়ের সবচেয়ে বেশি সাড়ে ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে হাবিব ব্যাংক। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ডিপোজিট রেট সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ২৫ থেকে ৬ দশমিক ২৫। আর সবচেয়ে কম সুদ দিচ্ছে সিটি এনএ। ব্যাংকটির আমানতের সুদের হার দশমিক ১০ শতাংশ। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই) তিন মাস মেয়াদি আমানতে সাড়ে ৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। এছাড়া এফডিআরে আল ফালাহ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসি, উরি এবং কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন এর সুদের হার দশমিক ১৫ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত।

এদিকে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে ব্যাংক আমানতের সুদহার তলানিতে নেমে গেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ আমনতকারীরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে ব্যাংকের আমানতের উপর বিরূপ প্রভাব রোধে ঋণের সুদহারের মতো আমানতের সর্বনিম্ন সুদহারও বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত ৮ আগস্ট এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ। যা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। পরে ১১ আগস্ট ব্যাংকার্স সভায় তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা (সিইও) আমানতের সর্বনিম্ন সুদহার পরিবর্তনের সুপারিশ করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা নাকচ করে দেয়।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *