আজ পৌষ সংক্রান্তি-

জাতীয়

স্বীকৃতি বিশ্বাস।

ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী সংক্রান্তি একটি সংস্কৃত শব্দ। এর দ্বারা সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করা বুঝায়। ১২ টি রাশি অনুযায়ি ১২ টি সংক্রান্তি আছে। পৌষ সংক্রান্তিকে মকর সংক্রান্তিও বলা হয়। মকর সংক্রান্তি শব্দটা দিয়ে নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশকে বুঝানো হয়ে থাকে।
পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিশেষ উৎসব।বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিন এই উৎসব পালিত হয়ে থাকে।
আগেকার দিনে শুধু নয় ষাটের দশকে কৃষকরা আউশ ও আমন দুই ধরনের ধানের চাষ করতো।আউশ ধানের সাথে সাথী ফসল হিসাবে তিল,তরমুজ, বাঙ্গিসহ আমন ধানেরও চাষ করা যেত। আউশ ধান কাটা হতো ভাদ্র মাসে। এই ধান উৎপাদনে জৈবসার ও নিড়ানি ছাড়া কিছু ব্যবহার হতো না তাই ফসলের উৎপাদন কম হতো।।যা কৃষকের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতো ভাদ্র আশ্বিন মাস পর্যন্ত। কিন্তু কার্ত্তিক অগ্রায়হণ মাসে অধিকাংশ কৃষকেরা খুবই অভাব অভিযোগের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করত।
আমন ধান ও আউশ ধানের সমসাময়িক সময়ে চাষ করা হলেও ধান উৎপাদন কম হতো এবং ধান উৎপাদনে সময়ও লাগতো বেশি।
এরপর নতুন ধানের জাত আবিষ্কৃত হয় অধিক ফলনশীল ইরি। কিন্তু প্রথমদিকে কৃষক এই ধান চাষের প্রতি বিশেষ আগ্রহী ছিল না কারন এধান চাষে জমিতে প্রচুর সার ও ধানের গাছে কয়েকবার কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়।যা কৃষকরা ব্যয় বহুল ও খাদ্য হিসাবে ঐধানের পুষ্টিমান নিয়ে সন্ধিহান ছিল।কিন্তু কৃষক তাদের কার্ত্তিক-অগ্রায়ন মাসের অভাব অভিযোগের কথা চিন্তা করল এবং দেখল অল্প জমিতে অধিক ফসল উৎপাদিত হয় ও তাদের অভাব কষ্ট দূর হয়।পরবর্তীতে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট জনেরা ঐ সকল ধান আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠলো এবং এই সময়ে একই জমিতে দো-ফসলের জায়গায় তিন ফসল উৎপন্ন করতে সমার্থ হল।বাঙালির অধিকাংশ উৎসব কৃষক ও কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত ফসল উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল। পৌষ সংক্রান্তিও তেমনি কৃষি ও কৃষকের সাথে সংশ্লিষ্ট বাঙালির উৎসব।

পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি- মূলতঃ নতুন ফসলের উৎসব। এই উৎসব ক্ষেতের পাকা ধান প্রথম ঘরে তোলা উপলক্ষে কৃষক পরিবারে পালনীয় অনুষ্ঠান। হেমন্তকালে আমন ধান ঘরে তোলার প্রতীক হিসাবে কয়েকটি পাকা ধানের শীষ ঘরে এনে কিছু নির্দিষ্ট আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
কোথাও বা পৌষ- সংক্রান্তির দিন দু-তিনটে ধানের শীর্ষ বিনুনি করে আউনি বাউনি তৈরি করা হয়। শীষের অভাবে দু-তিনটে খড় একত্রে লম্বা করে পাকিয়ে তার সাথে ধানের শীষ,মূলোর ফুল,সরষে ফুল,আম পাতা ইত্যাদি এক সাথে গেঁথে ধানের গোলা,ঢেঁকি,বাক্স ও খড়ের চালে গুঁজে দেওয়া হয়।
বছরের প্রথম ফসলকে অতি পবিত্র ও সৌভাগ্যদায়ক মনে করে একটি পবিত্র লক্ষীর ঘটে সারা বছর ধরে সংরক্ষণ করা হয়।

পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি- পৌষ- পার্বণ উদযাপিত হয়। নতুন ধান,খেজুরের গুড় এবং পাটালি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করা হয় এবং প্রত্যেক বাড়িতে পিঠে খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। পিঠে তৈরির জন্য গুড়, নারকেল, দুধ ও চালের গুড়ার প্রয়োজন হয়।

মকর সংক্রান্তি নতুন ফসলের উৎসব ছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতিতে ‘উত্তরায়ণ সূচনা হিসাবে পরিচিত। একে অশুভ সময়ের শেষ হিসাবেও চিহ্নিত করা হয়। পঞ্জিকা মতে জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়।
মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে বাংলাদেশসহ ভারতের বিভিন্ন নদীতে পূণ্যস্নাণ ও বিরাট মেলার আয়োজন দেখা যায়।
এই দিন বাভালির ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ দেখা যায় এবং প্রতিটি বাড়িতে বাস্তপূজা যা গোলার সামনে বসুমাতা ও ধনের দেবীকে উদ্দেশ্য করে করা হয়। আর এই পূজা উপলক্ষে কৃষকের ঘর,উঠান ও গোলায় বিভিন্ন রংবেরঙের আলপনা দেয়।যা গ্রাম্য শিল্পকে চমৎকার ভাবে তুলে ধরে।
ওছাড়াও এইদিন ঘরে ঘরে আত্মীয় স্বজন বেড়াতে আসে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গরুর লড়াই, বিলুপ্ত প্রায় যাত্রাগান,বাউলগানসহ বিভিন্ন গ্রামীণ নাচগানের আয়োজন করা হয়।
পৌষ সংক্রান্তির উৎসবের আমেজ আধুনিক নগরায়নে জন্য অনেকাংশেই মলিন হতে চলেছে। তার উপর করোনার দ্বিতীয় ধাপের আক্রমনের কারনে গ্রাম্য সংস্কৃতির এই উৎসব এবার সাড়ম্বরে পালনের কোন পদক্ষেপই নেয়নি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *